ভারত সব সময় বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতীম দেশ হিসেবে উন্নয়নের অংশীদার থাকতে চায় …. হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা
ভারতীয় হাই কমিশনার মি. হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। প্রতিবেশী হিসাবে আমরা দীর্ঘকাল ধরে বন্ধুপ্রতীম সম্পর্ক নিয়ে বসবাস করছি। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশিদার হয়ে এই বন্ধুত্ব কাজে লাগাতে চায়। আজ আমি বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত এলাকা ভান্ডারিয়ায় এসে এখানকার আতিথেয়তায় ও জনগণের ভালবাসায় মুগ্ধ হয়েছি।
তিনি রবিবার দুপুরে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া পৌরসভার বাসিন্দারের জন্য ১১টি সুপেয় পানি শোধনাগার নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন। এসময় মঞ্চে ছিলেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।
তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করেছে যা আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে মূল্যবান ও উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি। গত পাঁচ বছরে ভারত সরকার বাংলাদেশে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ২৪টি প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। আমি আন্তরিকভাবে আশা করছি যে এই ক্ষুদ্র অবদান বাংলাদেশে আমাদের বন্ধুদের জীবনে একটি গুনগত পরিবর্তন আনবে। এর প্রেক্ষিতে আজ আমরা ভান্ডারিয়া উপজেলায় ১১টি জল শোধনাগার স্থাপনের কাজ উদ্বোধন করছি। আমরা খুবই গর্বিত যে এই জল পরিশোধন প্রকল্পগুলো ভান্ডারিয়া এবং এর নিকটবর্তী পৌর সভার দেড় লাখ মানুষকে বিশুদ্ধ ও মিষ্টি পানীয় জল সরবরাহ করবে।
এই কাজের জন্য ভারত সরকার ভান্ডারিয়া পৌরসভাকে সাড়ে ১১ কোটি টাকা সরাসরি নগদ অনুদান দিচ্ছে। প্রকল্পটির কাজ দ্রুত শুরু করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালের অক্টোবরে ভান্ডারিয়া পৌরসভাকে আগাম ২ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছিলো। পানোপযোগী করার জন্য প্রতিটি জল শোধনাগারে জল থেকে ভারী ধাতু, আর্সেনিক ও লবনাক্ততা অপসারণ করা হবে। প্রকল্পের কাজ আগামী নয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তিনি বলেন যদিও ভারত সরকার জল শোধানাগারগুলি স্থাপনে সহযোগিতা করছে তবে তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। যার উদ্যোগে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। মাননীয় মন্ত্রী ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক দৃঢ় সমর্থক। ভারতের একজন ভালো বন্ধুও বটে। মাননীয় মন্ত্রীকে তাঁর প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানান হাইকমিশনার। তিনি বলেন, এই সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব চির অটুট থাকবে এবং আরও গভীর হবে। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশিদার হিসাবে এই বন্ধুত্বকে কাজে লাগাতে চায়। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ভারত আরও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং নতুন নতুন আরও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। তিনি এ এলাকার নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কথা উল্লেখ করে বলেন, তাঁর নেতৃত্বে ভান্ডারিয়ায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দু’দেশের উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন। এখানে আসতে পেরে এবং এখানকার বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দেখে আপ্লুত। 
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেন, আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত ভান্ডারিয়ায় সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য আজ যে প্রকল্পের সূচনা করলো তার জন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমি মাননীয় হাই কমিশনার মি. হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে ধন্যবাদ জানাই। এ এলাকার মানুষ এ প্রকল্পের সুফল হিসেবে লবনাক্ত ও আর্সেনিক মুক্ত সুপেয় পানি পানের সুফল পাবেন। যা এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকরি ভূমিকা পালন করবে। ভান্ডারিয়াবাসী সবসময় শান্তি-শৃংখলার মধ্যে বসবাস করে। এখানকার জনগণ ঔপনৈবেশিক ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তারা স্বাধীনতার আগের ও পরের রাজনীতির পার্থক্য অনুধাবন করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের ব্যাপৃত। ক্ষুদ্র স্বার্থ, গতানুগতিক মানসিকতা এবং বিভাজনের রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে গত ৩২ বছরে আমরা এখানে একটি সুস্থ ধারার সমাজ ব্যবস্থা স্থাপনে সচেষ্ট। সকল সরকারের সময়ই ভান্ডারিয়ার মানুষ উন্নয়ন সহযোগিতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এখানে নিরাপত্তা ক্ষেত্রে কারও কোনো শঙ্কার কারন নেই। আগামী নির্বাচনে ভান্ডারিয়া-কাউখালী-ইন্দুরকানী সংসদীয় এলাকার জনগণ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। যখন সারা দেশে বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় হানাহানি ছিল, ভান্ডারিয়া তার ব্যতিক্রম। এখানকার মানুষ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠে বহুমাত্রিক সংস্কৃতিক লালন করে বসবাস করছেন। এখানে তখনও সাম্প্্রদায়িক সম্পর্কের অবনতি ঘটে না। গত ৩২ বছরে এখানে স্কুল-কলেজ নির্মাণ, রাস্তা-ঘাট অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ মানুষের জীবন-যাপনের ধারা ছিল স্বাধীন দেশের উপযোগী 
পিরোজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন, পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম শেখ, পুলিশ সুপার মোঃ সালাম কবির, উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল তালুকদার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ভান্ডারিয়া পৌর প্রশাসক শাহীন আক্তার সুমী, উপজেলা জেপি’র যুগ্ম আহবায়ক ও পৌর কাউন্সিলর গোলাম সরওয়ার জমাদ্দার, জেপি’র উপজেলা সদস্য সচিব ও ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রশিদ তারেক ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কিরন চন্দ্র বসু।
এসময় মঞ্চে ছিলেন অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ইত্তেফাকের প্রকাশক তারিন হোসেন, ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারী নবনিতা চক্রবর্তী, প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠান আয়ন এক্সচেঞ্জ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এমজে শেখ, উপজেলা জেপি’র আহবায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম মনি জমাদ্দার প্রমুখ।
বর্ণিল সাঁজে সেঁজেছিল ভান্ডারিয়া
ভারতের হাইকমিশনার মি. হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার শুভাগমনকে ঘিরে রবিবার ভান্ডারিয়া পৌর এলাকা এক উৎসবের জনপদে পরিণত হয়। সড়ক পথ জুড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের হাইকমিশনার মি. হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র রং বেরংয়ের ছবি দিয়ে সাঁজানো হয়। বিলবোর্ড ও অসংখ্য তোরন সজ্জিত করা হয় বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা দিয়ে। রাস্তার দু’ধারে ছিল নানা রংয়ের পতাকা টানানো হয়। পানি সরবরাহ প্রকল্পের উদ্বোধনী স্থল ছিল আরও মনোরম ছবিতে সুসজ্জিত। অনুষ্ঠান স্থল মজিদা বেগম মহিলা কলেজ চত্বর হাজারও মানুষের সমাবেশ এবং সম্মানিত অতিথিকে বরণ করার আনন্দে মুখরিত। গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকা থেকে ভারতীয় হাই কমিশনার হেলিকপ্টারযোগে ভান্ডারিয়ায় আসেন এবং এ নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের পর স্থানীয় মজিদা বেগম মহিলা কলেজ প্রাঙ্গনে এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
সুপেয় পানি সরবরাহ প্রকল্প
১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভারতের অনুদানে ভান্ডারিয়ায় এ শোধনাগার নির্মাণ কাজ আজ শুরু হলো। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে এদেশে ভারতীয় অনুদানে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প নির্মানের চুক্তি স্বাক্ষর করেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এ শোধনাগার নির্মাণ। এ প্রকল্পের আওতায় আনুমানিক ৬শ’ ফুট গভীরতা সম্পন্ন ১১টি নলকূপ স্থাপন করা হবে। পরিশোধিত জল ১১টি এলাকার প্রতিটিতে ৪০ হাজার লিটার করে বৃহৎ ট্যাংকে সংরক্ষণের জন্য তোলা হবে।
