আধাঁর ঘরে চাদের আলো
সোমবার সারা দেশে এক যোগে প্রকাশ হলো এ বছরের এসএসসি ও সমমানের সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল। আর এতে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার ১নং ভিটাবাড়িয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে হত দরীদ্র ফামিতা আক্তার। মঙ্গলবার ফাতিমা আক্তারের বাড়িতে গেলে একটি জরাজীর্ণ ঘরে বৃদ্ধ দাদা চান্দে আলী মৃধা এবং দাদী শাহীনুর বেগমকে দেখা যায়। এসময় বয়সের ভারে ন্যুজ্জ দাদা চান্দে আলী জানান, তার ছেলে মজিবুর রহমান মৃধা স্ত্রী, সন্তান নিয়ে চট্রগাম থাকে।
পরে খোঁজ নেয়া হয় ফাতিমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ছিদ্দিকুর রহমান। তার সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, মেয়েটি রোদ, ঝড়, বৃষ্টি উপেক্ষা করে অর্ধাহারে, অনাহারে নিয়মিত ক্লাস করেছে। পোষাক পরিচ্ছদের অভাব থাকলেও তা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। দুই শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তো ভালো ফলাফলের জন্য। কিন্তু সে শিক্ষকরা ওর পরিবারের এ করুন অবস্থার জন্য টাকা নিতনা। যথেষ্ট চড়াই উৎরাই পার করে জিপিএ-৫ এর সাফল্য অর্জন করেছে। পরে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ফাতিমা আক্তারের পরিবারের একটি ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কথা হয় তার পরিবারের সাথে। এসময় বেড়িয়ে আসে নিয়তীর নির্মম পরিহাসের গল্প!
ফাতিমার বাবা মো. মজিবুর রহমান মৃধা ওই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চল ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। পেশায় দিন মজুর ছিল। সংসারের ঘানি টানতে টানতে এক সময়ে দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে পরায় টানা পোড়েনের সংসারে নেমে আসে কঠিন দারিদ্রতা। মজিবুরের বাবা, মা, স্ত্রী, তিন মেয়ে নিয়ে সংসার। উপায়ন্ত না পেয়ে বড় মেয়ে কুলসুম আক্তার ১০/১২ বছর বয়সে চট্রগ্রামে একটি গ্রার্মেন্টস এ চাকুরী শুরু করে সংসারের কিছুটা হাল ধরে। তার পরে ফাতিমার মা মাকসুদা বেগম গার্মেন্টস সংলগ্ন একটি মহিলা হোস্টেলে ৬ হাজার ৫০০ টাকার মাসিক বেতনে আয়ার কাজ করে এবং ছোট বোন মারুফা আক্তার ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ে ১০ বছর বয়সেই মা, বোনের কাছে থেকে একই এলাকায় একটি সু-কোম্পানীর রিসিপশনে কাজ করে। এর মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায়। তখন মা এবং ছোট বোনের আয়ে বাবার চিকিৎসা ও থাকা খাওয়ার পর আমার জন্য কোন মাসে ৫০০ টাকা আবার কোন মাসে ৭০০ টাকা পাঠাতো। দাদা চান্দে আলী বয়স্ক ভাতার টাকা এবং মা-বোনের পাঠানো টাকায় সংসার চালানোর পরে লেখা পড়ার জন্য বাড়তি টাকা থাকত না !
এমনি ভাগ্য যখন পড়া লেখার চাপ, তখন ছিলনা বিদ্যুৎ। গত ৭/৮দিন আগে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে। অথচ প্রয়োজনের সময় পড়তে হত কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে। সহপাঠীরা স্কুল ছুটির পরে একটু খেলা ধুলার সময় পেলেও আমাকে তখন বই নিয়ে বসতে হত। কারণ যদি রাতে কেরোসিন না থাকে! ফরম ফিলাপও করতে হয়েছে কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে। ফাতিমার কষ্টাতুর কন্ঠের মধ্যেও ভবিষ্যত সর্ম্পকে জানতে চাইলে ফাতিমা জানান, যত কষ্টই হোক আমাকে ব্যারিষ্টার হতে হবে। অন্য পেশা থাকতেও ব্যারিষ্টার কেন- এমন প্রশ্নে ফাতিমা জানান, সাধারণ মানুষ বড় লোকের নানা ধরনের চাপে অনেক সময় ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। বিচার ব্যবস্থায় যে বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষ যাতে বিচারহীনতার স্বীকার না হয়। তাই মহান আল্লাহতালা যদি সহায় থাকেন তা হলে ব্যারিষ্টার হয়ে বিনা টাকায় সাধারণ মানুষের সুবিচারের জন্য পাশে দাড়াবো। ব্যারিষ্টারি পড়াতো অনেক ব্যয়বহুল বিষয়? হ্যা সেটা আমি জানি, সমাজে এখনও অনেক ভালো বৃত্তবান আছে। তারা যদি আমাকে সামনে আগাতে সহায়তা করে তা হলে আমি সফল হবোই এ দৃঢ় প্রত্যয় ফাতিমার। আর সে জন্য সকলের দোয়া এবং বৃত্তবানদের সাহায্য কামনা তার। প্রয়োজনে ফাতিমা আক্তার ০১৭৪৯৫৯১৬১৯। ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বর্তমান উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. মশিউর রহমান মৃধা পরিবারটির কঠিন বাস্তবতার কথা স্বীকার করে জানান, মেয়েটি যথেষ্ট কষ্ট করে আজকে এই সফলতা অর্জন করেছে। আমি তার ভবিষ্যৎ উজ্জল কামনা করছি।
