ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা
স্কুল ছাত্রী রুপার আত্মহত্যার ঘটনায় প্রধান আসামী তামিম সাত দিনের রিমান্ডে
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলা সদরে বখাটেদের উৎপাতে স্কুল ছাত্রী রুকাইয়া আক্তার রূপার আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে রুজুকৃত মামলায় গ্রেফতার প্রধান আসামী তামিম খানকে আদালত সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে দিয়েছেন। আজ রবিবার পিরোজপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেটের আদালতের বিচারক এ আদেশ দেন। এর আগে শনিবার বিকেলে মামলার প্রধান আসামী তামিম খানকে ভান্ডারিয়া উপজেলার এক প্রভাবশালী নেতার বাসার খাটের তলা থেকে পুলিশ তামিমকে গ্রেফতার করে।
স্থানীয় বন্দর সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী রুকাইয়া আক্তার রূপার আত্মহত্যার ঘটনার মামলায় তামিম খানসহ পাঁচ জন নামীয় এবং অজ্ঞাত ৩/৪ জনকে আসামী করে থানায় মামলা হয়েছে। শনিবার রাতে রূপার বাবা মো. রুহুল আমিন মুন্সি বাদী হয়ে দন্ডবিধির ৩০৬ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ভান্ডারিয়া থানায় এ মামলা করেন। উপজেলা সদরের মঞ্জু খানের ছেলে তামিম খানসহ মামলার অন্য আসামিরা হলো- দক্ষিণ ভান্ডারিয়া গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মো. রাইয়ান (২০), রুপার সহপাঠি মৃত বাবুল খানের মেয়ে ইরিন (১৮), সৈয়দ রফিকুল ইসলামের ছেলে সাজিদ ইশরাক (১৮) এবং নিজ ভান্ডারিয়া গ্রামের আলম জোমাদ্দারের ছেলে মো. অলি জোমাদ্দার (২০)সহ অজ্ঞাত আরো ৪/৫জন রয়েছে।
মামলার ১নং আসামী তামিম খানকে (১৯) শনিবার বিকেলে উপজেলা শহরের তার প্রতিবেশীর বাড়ী থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান জানান।
আজ রবিবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভান্ডারিয়া থানার এসআই মো. কাইয়ুম আসামী তামিমকে পিরোজপুরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত করে ১০ দিনের রিমান্ড চান। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে ভান্ডারিয়া থানার ওসি এস. এম. মাকসুদুর রহমান জানান।
থানায় দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা গেছে, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইজে প্রতারণার মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ এর সাথে সহায়তার অপরাধসহ আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে স্কুল ছাত্রী রূপা আত্মহত্যা করায় আসামীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ সালের ২৩/২৯/৩৫সহ পেনাল কোডের ৩০৬ ধারায় এ মামলাটি রুজু করা হয়।
জানা গেছে, স্কুল ছাত্রী রূপার একটি ছবি অশ্লিল ফটোশপ করে তা প্রধান আসামী তামিম তার বন্ধু-বান্ধবসহ বিভিন্ন লোকের মোবাইলে ছড়িয়ে দেয়। এদিকে, রূপার আত্মহত্যার ঘটনার পর থেকে যাতে মামলা না হয় এবং দায়ী ব্যক্তিদের পুলিশ গ্রেফতার না করে সে জন্য স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী মহল পরোক্ষভাবে সচেষ্ট ছিলেন বলে জানা যায়।
এ ব্যাপারে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান বলেন, ঘটনা জানার পর থেকে পুলিশ খুবই তৎপর হয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে কোন দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই স্থানীয় এক প্রভাবশালীর বাড়ী থেকে মূল আসামীকে গ্রেফতার করেছে। বাকি আসামীদেরও অবিলম্বে গ্রেফতারে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নারী ও শিশু সুরক্ষা সেল করে পুলিশের পিরোজপুর জেলায় ইতিমধ্যে বিশেষ কর্মসূচি চালু হয়েছে। ভান্ডারিয়াসহ এ জেলার আইন শৃঙ্খলা ক্ষেত্রে বিরাজমান সুনাম বজায় রাখতে পুলিশ বদ্ধপরিকর।
এদিকে, শনিবার ময়না তদন্ত শেষে পুলিশ পরিবারের কাছে রূপার মরদেহ হস্তান্তর করে। পরে রাত ৯ টায় ভান্ডারিয়া উপজেলা সদরের ৬৭নং নিজ ভান্ডারিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রূপার নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, জাতীয় পার্টি-জেপি’র উপজেলা সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জেপি নেতা মশিউর রহমান মৃধা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফাইজুর রশিদ খশরু জোমাদ্দার, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল তালুকদার, বিএনপি নেতা মো. মহিউদ্দিন খান দীপুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ জানাজায় শরিক হন।
রবিবার দুপুরে রূপার বাসভবনে গিয়ে দেখা যায় মেয়ের মৃত্যুতে বাবা রুহুল আমিন মুন্সি নির্বাক, মা শান্তা বেগম অঝোরে কাঁদছেন, বড় বোন নুসাইয়া আক্তার হিরাসহ অন্য ভাই-বোনেরা শোকে কাতর।
রূপার বাবা রুহুল আমিন মুন্সি জানান, তার মেয়ের আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের বাঁচাতে একটি মহল নানাভাবে চক্রান্ত শুরু করায় তিনি এর ন্যায় বিচার পাবেন কিনা সে বিষয়ে সংকিত।
উল্লেখ্য, ভান্ডারিয়া উপজেলায় বখাটের প্রেম প্রত্যাখ্যান করায় ইন্টারনেটে এডিট করে অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেয়ায় রুকাইয়া আক্তার রূপা আত্মহত্যা করে। ক্ষোভে এবং লজ্জায় ঘরে থাকা ঘুমের ওষুধসহ একত্রে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন করে শুক্রবার গভীর রাতে সে আত্মহত্যা করে। রূপা স্থানীয় বন্দর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী এবং ব্যবসায়ী রুহুল আমিন মুন্সীর মেয়ে।
