প্রধান সূচি

ভাঙা সড়কে প্রতিদিনের দুর্ভোগ

প্রতিটি সকাল যেন এই অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন এক সংগ্রামের নাম। একদিকে পিঠে ভারী বইয়ের ব্যাগ, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে ছুটে চলা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা; অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে পথে বের হওয়া হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু সবার পথই এসে থেমে যায় একই দুর্ভোগ আর আতঙ্কের কাছে। এটি কোনো দুর্গম পাহাড়ি পথের গল্প নয়, বরং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষীপুরা গ্রামের মধ্য দিয়ে ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের প্রতিদিনের বাস্তবচিত্র।
প্রতিদিন সকালে এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে ভান্ডারিয়া বিহারী লাল মিত্র পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬৮ নম্বর হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভান্ডারিয়া শাহাবুদ্দিন সিনিয়র কামিল মাদরাসা, ভান্ডারিয়া বন্দর সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভান্ডারিয়া মজিদা বেগম মহিলা কলেজ ও থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী।
পাশাপাশি সাধারণ পথচারী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ হাজারো মানুষকে প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করে চলতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই এই সড়কটি আর সড়ক থাকে না, হয়ে ওঠে এক হাঁটু কাঁদা আর গর্তে ভরা জলাশয়। তখন সড়কটি আর চলাচলের উপযোগী থাকে না। রিকশা, ভ্যানসহ ছোট যানবাহন চলাচলের সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। কখনো যানবাহন উল্টে যাচ্ছে, আবার কখনো গর্তে আটকে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
এই সড়ক ব্যবহারকারী অসুস্থ রোগীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে নেওয়ার সময় ভাঙাচোরা সড়কের প্রতিটি ঝাঁকুনি যেন বাড়িয়ে দেয় রোগীর কষ্ট। অন্যদিকে রিকশা ও ভ্যানচালকদেরও প্রতিনিয়ত গুনতে হচ্ছে আর্থিক ক্ষতির মাশুল।
বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বেড়ে যায়। সকালে পরিপাটি পোশাকে স্কুলে বের হলেও কাঁদা-পানিতে অনেকের জামা-কাপড় নোংরা হয়ে যায়, ভিজে যায় বই-খাতাও। ফলে কাঁদামাখা ও ভেজা পোশাকেই তাদের ক্লাস করতে হয়।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মমিতা আক্ষেপ করে বলে, সকালে সুন্দর করে ইউনিফর্ম পরে স্কুলে বের হই। কিন্তু একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় কাঁদা-পানিতে গর্ত দেখা যায় না। প্রায়ই পিছলে পড়ে জামাকাপড় নষ্ট হয়, বই-খাতাও ভিজে যায়। ভেজা ও কাদামাখা কাপড়ে ক্লাস করতে খুব কষ্ট হয়।
অভিভাবক আল আমিন মুন্সি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি। রিকশায় উঠলেও মনে হয়, এই বুঝি উল্টে গেলাম। এটা শুধু একটা রাস্তার সমস্যা না, আমাগো পুরো এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কারণ।
রিকশাচালক কালাম হাওলাদার বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়া গ্যালে রিকশার পার্টস ভাইঙ্গা যায়। চাকা গর্তে পইড়া কাইত হইয়া যায়। সারাদিন যে কয় টাকা কামাই করি, তার অর্ধেকের বেশি চইলা যায় রিকশা ঠিক করতে।’
স্থানীয়দের দাবি, সড়কটি দ্রæত সংস্কার করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এ বিষয়ে ভান্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. হাসিবুল হাসান জানিয়েছেন, সড়কটি সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পৌর প্রকৌশলীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভান্ডারিয়া পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী গাজী নজরুল ইসলাম জানান, সড়কটির সংস্কার কাজের অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলেই দ্রæত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় সময় লাগলেও মানুষের দুর্ভোগ কি থেমে থাকবে? কাঁদা পানিতে আটকে থাকা হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন তো অপেক্ষা করতে পারে না। তাই ভান্ডারিয়াবাসীর প্রত্যাশা, কাগজপত্র ও অনুমোদনের ফাইল দ্রæত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে। সংস্কারের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক রূপ, আর হাজারো মানুষ ও শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের পথচলা মুক্ত হবে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও আতঙ্ক থেকে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial