পিরোজপুরে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে অপচিকিৎসায় প্রাণ গেল স্কুল ছাত্রের
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের চাকুরীরত কিছু কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত একটি দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে অপচিকিৎসায় ৯ম শ্রেণি পড়ুয়া এক স্কুল ছাত্র মারা গেছে। নিহত তুষার শেখ (১৪) পিরোজপুর পৌরসভার ঝাটকাঠি এলাকার সোহাগ শেখের ছেলে এবং পিরোজপুর টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্র।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ দুই জনকে আটক করেছে।
নিহত তুষারের চাচা মো. হিরণ শেখ জানায়, বুধবার বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে পিরোজপুর শহরতলীর মুক্তারকাঠী এলাকায় বলেশ^র নদীর পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিল তুষার। এ সময় ব্যাটারী চালিত একটি অটোরিক্সা উল্টে তুষারের উপর পড়লে তার ডান পা ভেঙ্গে যায়। স্বজনরা তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রেফার করেন। এরপর সদর হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার পর রাত ৮টার দিকে পিরোজপুর শহরের অবকাশ মোড় এলাকায় পিরোজপুর এ্যাম্বুলেন্সটি থামিয়ে দেয় চালক কবির হোসেন। সাথে সাথে সেখানে হাজির হয় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে কর্তব্যরত ফার্মাসিস্ট সচিন রায়, ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী মাজেদুল ইসলাম ও মনির হোসেন সহ আরও কয়েকজন।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের সময় খুলনায় চিকিৎসা পাওয়া যাবে না এই ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা তুষারকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে শুরু করে। তাদের কথায় আশ^স্ত হয়ে তুষারের স্বজনরা ৩০ হাজার টাকা চুক্তিতে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করাতে রাজী হয়। এরপর সেখান থেকে তুষারকে পিরোজপুর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের ভাইজোড়া এলাকার একটি বাড়ির বৈঠকখানায় (কাঁচারী ঘর) নিয়ে সেখানেই তুষারের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে ফার্মাসিস্ট সচিনের নেতৃত্বে ৬/৭ জনের তথাকথিত মেডিকেল টিম। এরপর তুষারকে অনেকগুলো ইনজেকশন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রাত ১২টার দিকে তাদের জানানো হয় যে, জরুরি ভিত্তিতে তুষারকে অক্সিজেন দেওয়া দরকার। তাই তারা তুষারকে একটি অটোরিক্সায় করে তড়িগড়ি করে পুনরায় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর সেখান থেকে সটকে পড়ে ওই দালাল চক্রটি।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেলা অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন জানান, আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পরে যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদানের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তুষারকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল। পরে রাত ১২টার দিকে তাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, অপচিকিৎসা প্রদানের সাথে হাসপাতালের কেউ জড়িত থাকার অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. নুরুল ইসলাম বাদল বলেন, ভুয়া চিকিৎসায় এক স্কুল ছাত্রের মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি (ওসি) সহ থানা পুলিশ রাতেই হাসপাতালে যাই। রাত পৌনে ১টার দিকে ওই ঘটনার সাথে জড়িত ভুয়া ডাক্তার দুই জনকে আটক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য জেলা হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে কর্মরত কিছু কর্মচারীদের সহায়তায় একটি চক্রটি ভুয়া ডাক্তার সেজে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসাসহ অস্ত্রপচার করে আসছে। তারা হাসপাতালে আসা রোগীদের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ভাল চিকিৎসার কথা বলে শহরতলীর ভাইজোড়া গ্রামের তাদের কথিত আস্তানায় নিয়ে গিয়ে অপচিকিৎসা করে চলছে। আর চক্রের হোতা পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট সচিন রায় বলে জানা গেছে। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছে হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স চালক কবির হোসেন, হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী (নাইটগার্ড) মাজেদুল ইসলাম এবং মনির হোসেন।
