ভূয়া মাস্টার রোল তৈরী, কালো বাজারে চাল ও আটা বিক্রির অভিযোগ
পিরোজপুরে ওএমএস’র ডিলাররা খাদ্য ব্যবসায়ী নন
পিরোজপুর জেলার ৪টি পৌর এলাকায় ২০জন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএস’র চাল ও আটা বিক্রয় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে এসব ওএমএস ডিলারদের বেশীর ভাগই খাদ্য ব্যবসায়ী নন। বিগত দিনে রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট, প্রভাবশালীদের অনুগত ও নিকট আত্মীয়দের ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সরকারি দলের নেতা বা পেশী শক্তিধারী হওয়ায় সরকারি নিয়মানুযায়ী এসব ডিলারদের মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। যাদের নামে ডিলারশীপ দেয়া হয়েছে তারা অব্যবসায়ী বলে পিরোজপুর শহরে এ কার্যক্রম চালানো হয় স্থানীয় বাজারের কিছু প্রশ্নবিদ্ধ খাদ্য ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। যেসব ঠিকানা ব্যবহার করে কোন কোন ডিলার খোলা বাজারে খাদ্য বিক্রির সরকারি অনুমোদন পেয়েছেন তার মধ্যে কারো কারো ঠিকানা ভূয়া। সাধারণ ক্রেতারা এসব ভূয়া ঠিকানায় গিয়ে চাল বা আটা না পেয়ে নিরাশ হয়ে খালি হাতে ফিরেও আসছেন।
পিরোজপুর পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ডে ৯জন ডিলারের মাধ্যমে ৯টি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র থেকে কেন্দ্র প্রতি প্রতিদিন ১১’শ ১০ কেজি চাল ও আটা বিক্রি করার সরকারি নিয়ম রয়েছে। চাল ৩০ টাকা দরে ও আটা ১৮ টাকা দরে মাথাপিছু পাঁচ কেজি বিক্রি করার কথা। প্রতি ডিলার দৈনিক ২২২ জন সাধারণ ক্রেতার কাছে চাল বা আটা বিক্রি করবেন বলে জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছ থেকে নির্দেশনা রয়েছে এবং স্থানীয় খাদ্য গুদাম থেকে তা সংগ্রহ করে ২/৩ দিনের মধ্যে বিক্রি করার নিয়ম।
পিরোজপুর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে বসে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এ চাল বা আটা বিক্রি করার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে ৯নং ওয়ার্ডে দু’টি, ৭নং ওয়ার্ডে চারটি, ৫নং ওয়ার্ডে দু’টি ও ৪নং ওয়ার্ডে একটি ডিলারশীপের ঠিকানা দেয়া রয়েছে। ১, ২, ৩, ৬ ও ৮নং ওয়ার্ডে কোন ডিলারের দোকান না থাকায় ক্রেতারা শহরের অন্য সব দোকানে গিয়ে চাল ও আটা সংগ্রহ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত ডিলারদের বেশীরভাগ প্রকৃত খাদ্য ব্যবসায়ী না হওয়ায় যাদের মাধ্যমে চাল-আটা বিক্রি করা হয় তারা সময়মত দোকান খোলা রাখেন না। তাদের বিরুদ্ধে ক্রেতাদের নকল স্বাক্ষর দেখিয়ে, একই হাতের লেখায় মাষ্টার রোল তৈরী করাসহ ভূয়া মাস্টার রোল তৈরী করে কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল, কালো বাজারে চাল ও আটা বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত, গোয়েন্দা সংস্থা, সিভিল প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগ থেকে এসব ডিলারদের হুশিয়ার করে দেয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ হওয়ায় ডিলারদের ওএমএস কার্যক্রম সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে মত প্রকাশ করেছেন পিরোজপুর পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাদুল্লাহ লিটন। তিনি বলেন, সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা শহরের কয়েকটি বিক্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করে নানা অনিয়ম দেখতে পাওয়া যায় এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে মাপে কম দেয়া, মাস্টার রোলে দু’জনের নামে স্বাক্ষর করা, একই হাতের লেখার মাস্টাররোল তৈরী করা ইত্যাদি অভিযোগের কথা জানা যায়।
মঠবাড়িয়া পৌরসভায় যে চার জন ডিলারের মাধ্যমে চাল বিক্রি করা হচ্ছে তাদের তারা সকলেই প্রভাবশালীদের আত্মীয় বা আশীর্বাদপুষ্ট। শহরের টিএন্ডটি রোডে আব্দুল মালেক নামে যে ডিলার নিযুক্ত হয়েছেন তিনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান সিফাতের পিতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের জ্ঞাতিভাই। এ ভাবে উপজেলা চেয়ারম্যানের দু’জন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের আশীর্বাদপুষ্ট একজন বাকি তিনজন ডিলার। এ ডিলাররা দিনে মাত্র এক ঘন্টা করে চাল ও আটা দিয়ে বাকি সময় বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ রাখেন। সম্প্রতি রাতের আধারে একজন ডিলারের এই চাল গোপনে বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া নিয়ে এখানে তোলপাড় হয়। বিষয়টি প্রশাসনের কাছে অবহিত করা হলেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
পিরোজপুর জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ৫নং ওয়ার্ডের ওএমএস ডিলার গোলাম মাওলা নকীব বলেন, পিরোজপর পৌরসভায় ডিলারের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সকল ওয়ার্ডে নিয়োগসহ ৭/৮ মাস আগে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। কিন্তু তা আর কার্যকর হয়নি। এসব কারণে সাধারণ ক্রেতারা অনেকটা হয়রানীর কবলে পড়ছেন। ভান্ডারিয়া ও স্বরূপকাঠি এ দু’টি পৌরসভায় যথাক্রমে তিন ও চারজন করে ওএমএস ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। যারা গত ২৫ জুলাই থেকে স্ব স্ব পৌর এলাকায় চাল ও আটা খোলা বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। বাজারে চাল ও আটার মূল্যে এসব এলাকায় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
পিরোজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মশিউর রহমান বলেন, পিরোজপুর পৌর এলাকায় ৯জন ডিলারের মাধ্যমে গত কয়েক মাস ধরে খোলা বাজারে চাল ও আটা বিক্রি করা হয়। বাকি তিন পৌরসভায় ১১জন ডিলার ২৫ জুলাই থেকে কাজ করছেন। ওএমএস কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা তদারকি করছেন। পিরোজপুর পৌরসভার কোন কোন ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়াসহ তাদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। ডিলাররা প্রকৃত খাদ্য ব্যবসায়ী নন বলে যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, জেলা পর্যায়ে বিদ্যমান কমিটি ডিলার নিয়োগ করেন।
