প্রধান সূচি

ছেলেকে সৌদী আরবে নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে রোহিঙ্গাকে সাহায়তা করা হয়

পিরোজপুরে রোহিঙ্গাকে সহায়তাকারী এক মহিলা আটক

পিরোজপুরে রোহিঙ্গা আটকের ঘটনায় শাহিনুর বেগম (৪০) নামে এক মহিলাকে আটক করেছে পিরোজপুর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন সড়ক থেকে তাকে আটক করা হয়। আটক শাহিনুর ভান্ডারিয়া উপজেলার ইকড়ি গ্রামের মিজানুর রহমানের স্ত্রী। বর্তমানে তিনি ভান্ডারিয়া পৌর শহরের ২নং ওয়ার্ডে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন।

পুলিশ জানায়, আটক রোহিঙ্গা মো. জামালের কথিত মা শাহিনুর। সে রোহিঙ্গা জামালকে ভান্ডারিয়ায় আশ্রয় দিয়ে পিরোজপুর থেকে পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার সহাযোগিতা করছিল। পিরোজপুর ডিবি পুলিশ এর আগে গত রবিবার মো. জামাল (২১) নামে ঐ রোহিঙ্গা আটক করে।

পিরোজপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক হাচনাইন পারভেজ জানান, জামাল রবিবার পিরোজপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্টের আবেদন করার পর ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে যায়। এ সময় জানা যায় জামাল মায়ানমারের নাগরিক। এরপর সে ফিঙ্গার প্রিন্ট না দিয়ে ভান্ডারিয়ায় চলে যায়। পরে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে রবিবার সন্ধ্যায় জামালকে ভান্ডারিয়া থেকে আটক করে।

পাসপোর্টের আবেদনে আটক রোহিঙ্গা জামাল তার বাবার নাম মো. মিজান সিকদার, মায়ের নাম- শাহিনুর বেগম, গ্রাম- ভান্ডারিয়া, পৌর শহরের ২নং ওয়ার্ড লিখেছে। জিঙ্গাসাবাদে জামাল জানায়, সে মায়ানমারের নাগরিক, তার পিতা আমির হোসাইন, মায়ের নাম বেলুয়া বেগম সাং- রাম্যখালী, থানা ডেমিনা, জেলা রাখাইন (আরাকান)।

রোহিঙ্গা আটকের ঘটনায় সোমবার পিরোজপুর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে জামালকে প্রধান আসামি এবং সহযোগী আরো অজ্ঞাতনামা ৬/৭ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক হাচনাইন পারভেজ জানান, মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের সময় জামালের বাবা-মা মারা যায়। এ সময় জামাল তার দুই ভাই আবু তৈয়ব ও আবু হায়াত এবং তিন বোন রুখাইয়া, জামালিডা, সোমাকে নিয়ে ২০১৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসে। এরপর তারা কক্সবাজারের বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালের অন্য দুই ভাই সৌদী আরবে রয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা জামালের আশ্রয়দাতা এবং কথিত মা শাহিনুরের দুই ভাইও সৌদী আরবে থাকে। সৌদী আরবে একই জায়গায় কাজ করার সুবাদে রোহিঙ্গা জামালের ভাইদের সাথে ভান্ডারিয়ার শাহিনুরের ভাইদের মধ্যে সখ্যতা হয়। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা জামালকে সৌদী আরবে পাঠানোর জন্য তারা (জামালের ভাই) শাহিনুরের সাথে যোগাগোগ করে। এর প্রেক্ষিতে শাহানুর জামালকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট করিয়ে দিয়ে সৌদী আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিবে এবং বিনিময়ে জামালের ভাইয়েরা খরচ দিয়ে শাহানুরের প্রথম পক্ষের সন্তানকে সৌদী আরবে নিয়ে যাবে বলে তাদের মধ্যে মৌখিক চুক্তি হয়। আর সে অনুযায়ী জামাল প্রায় দেড় মাস আগে কক্সবাজারের বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় আসে। শাহিনুর রোহিঙ্গা জামালকে ভান্ডারিয়ার তার ভাড়া বাসায় রেখে নিজের সন্তান পরিচয়ে ভান্ডারিয়া পৌরসভা থেকে একটি জন্ম সনদ বের করে। আর উক্ত জন্ম সনদের মাধ্যমে এবং ভান্ডারিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করে জামাল পিরোজপুর জেলা পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে। আবেদনপত্র জমা দেয়ার পর গত রবিবার ফিঙ্গার প্রিন্ট (আঙ্গুলের ছাপ) দেয়ার প্রাক্কালে জানা যায় সে (জামাল) মায়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক। তার রিফিউজি নাম্বার- ১৩২২০১৮০১২০১৪৫৮৫২, বাংলাদেশে আগমনের তারিখ- ২৮/০৯/২০১৭। বিষয়টি পিরোজপুর পুলিশকে জানালো হলে পুলিশ পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার আগেই জামাল সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে ডিবি পুলিশের একটি টিম ঐ দিন সন্ধ্যায় জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলা থেকে জামালকে আটক করে।

এদিকে, রোহিঙ্গা জামালের জন্ম সনদ এবং পাসপোর্টের আবেদনে সুপারিশ করেছে ভান্ডারিয়া পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর (১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ড) বেবি আক্তার। আর পৌর কাউন্সিলর বেবি আক্তারের সনাক্তকারী সুপরিশের ভিত্তিতে ভান্ডারিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজমুল আলম রোহিঙ্গা জামালের জন্ম সনদ ইস্যু করেন।

এ বিষয়ে ভান্ডারিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজমুল আলম জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের সকলকে তো আমি চিনি না। এলাকার বাসিন্দা হিসেবে পৌর কাউন্সিলররা সনাক্ত করেন। তাদের সনাক্ত সুপারিশের ভিত্তিতে জন্ম সনদ বা নাগরিক সনদ পৌরসভা থেকে ইস্যু করা হয়। রোহিঙ্গা জামালের বিষয়ে মহিলা কাউন্সিলের সনাক্তের ভিত্তিতে প্রতিস্বাক্ষর দিয়ে জন্ম সনদ ইস্যু করা হয়েছিল।

এদিকে, রোহিঙ্গাকে জন্ম সনদ ইস্যুতে স্থানীয় বাসিন্দা সনাক্ত হিসেবে সুপারিশ করা এবং পাসপোর্ট আবেদনে সুপারিশকারী পৌর কাউন্সিলর বেবি আক্তরকেও খুঁজছে পুলিশ। তবে রোহিঙ্গা জামাল আটকের পর থেকে বেবি আক্তার গা-ঢাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, রোহিঙ্গা আটকের পর তাকে আশ্রয়দাতা এবং পাসপোর্ট করতে সহায়তাকারী এক মহিলাকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এর সাথে আরও যারা জড়িত তদন্তপূর্বক তাদেরও আটক করা হবে।

এদিকে, আটক শাহিনুরকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভান্ডারিয়া থেকে ডিবি পুলিশ পিরোজপুরে নিয়ে এসেছে। ডিবি পুলিশের পরিদর্শক হাসনাইন পারভেজ জানান, তাকে পিরোজপুরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial