পিরোজপুর শহরের শতবর্ষের প্রাচীন পুকুর ভরাট করতে নানা অপকৌশল ॥ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ
পিরোজপুর শহরের শিক্ষা অফিস সড়কে শতবর্ষ প্রাচীন একটি বড় পুকুর ভরাট করে সেখানে বাড়ী-ঘর নির্মান করার উদ্দেশ্যে পরিবেশ বিমুখ কর্মকান্ড প্রশাসনিক উদ্যোগে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থলে গিয়ে পুকুরটির চার জন মালিকের কাছে থেকে পুকুর ভরাট থেকে বিরত থাকতে মুচলেকা নিয়েছেন।
পায়খানার সেপটি ট্যাংক থেকে পাইপে মলমুত্র নি:সারণ, ময়লা-আবর্জনা ফেলাসহ নানা অপকৌশল করে পুকুরের পানি দুষিত-দুর্গন্ধময় করে তোলা হয়েছিল পুকুরটি ভরাটের উদ্দেশ্যে।
জানা গেছে, পিরোজপুর শহরের মধ্যরাস্তা এলাকার বাসিন্দা মৃত মোবারক আলী শেখের পিতা জবান উল্লাহ শেখ ১১০ বছর আগে একটি পুকুর খনন করেন। এরপর থেকে ওই পুকুরটি স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যবহার করে আসছেন। পরে পুকুরটি মোবারক আলী শেখের ছেলে ও শরিকগণ চার ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। তবে পুকুরের তিন পাশে অনেকগুলো পাকা-আধাপাকা ঘর-বাড়ী নির্মিত হয়েছে। পুকুরের দুই পাশে পৌরসভা রাস্তা ও গাইড ওয়াল তৈরী করেছে এবং আরেক পাশে একই স্থাপনা নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হয়েছে বলে প্রকাশ। প্রায় এক একর জায়গায় অবস্থিত এই বড় পুকুরটি দীর্ঘকাল ধরে এলাকাবাসী নানা প্রয়োজনে ব্যবহার করে আসছিলো। এক সময় যৌথ উদ্যোগে এখানে যেমন মাছ চাষ হতো আবার খাবার পানির উৎস হিসাবে জরুরী সময় ব্যবহৃত হয়েছে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পরে পৌর পানি সরবরাহ ব্যহত হওয়ায় বাসিন্দারা এখান থেকে পানি নিয়ে ব্যবহার করতেন। এছাড়া ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সুপার সাইক্লোন সিডরের পরে পিরোজপুর শহর প্রায় ১৫ দিন বিদ্যুৎ বিহীন ছিল। ফলে তখন শহরে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তখন এই পুকুরটিই ছিল শহরবাসীর পানি যোগানদাতা অন্যতম উৎস্য।
পুকুরটি একাধিক ব্যক্তি মালিকানার হওয়ায় চার জন মালিক আব্দুল খালেক শেখ, মাহবুবুর রহমান, আল আমিন শেখ, মাহফুজুর রহমান ভরাটের উদ্যোগ নেন। এর আগে গত প্রায় এক বছরে পুকুর তীরবর্তী কেউ কেউ পায়খানার ময়লা পাইপ দিয়ে পুকুরে নি:সারণ করায় পানি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়। সম্প্রতি মৃত মোবারেক আলীর পুত্রবধু নারী নেত্রী কানিজ ফাতিমা হাসি পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কাছে পুকুরটি ভরাটের উদ্যোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে লিখিত আবেদন করেন। এরপর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রামানন্দ পাল পুকুরের মালিকদের ডেকে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া পুকুর ভরাট বন্ধের মুচলেকা নেন। আবেদনকারী কানিজ ফাতিমা বলেন, আমার স্বামী মহিত শেখ ভরাট না করার শর্তে তা বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে পুকুরটি ভরাটের যুক্তি সৃষ্টির জন্য উদ্যোক্তারা কৌশলে পানি দুষিত করে।
পিরোজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা নকীব বলেন, এ পুকুরে এক সময়ে সাঁতার প্রতিযোগিতা হতো। আশেপাশের ছাত্র ও তরুণরা এখানে সাঁতারের অনুশীলন করতো। পুকুরের অন্যতম মালিক মাহবুবুর রহমান বলেন, পুকুরটি কয়েক বছর ধরে ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আমরা এটি ভরাটের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে গেছে। পুকুরের নষ্ট পানিতে মাছ চাষ পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম শেখ বলেন, শহরে বা এলাকায় অগ্নিকান্ড ঘটলে ফায়ার বিগ্রেড এ পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে থাকে। তা ছাড়া দুর্যোগ-দুর্বিপাকে শহরবাসী এখান থেকে জরুরী খাবার পানি নিয়ে থাকে।
উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রামানন্দ পাল বলেন, জলাধার আইনে পুকুর শ্রেণিভুক্ত জলাশয় ভরাট করতে হলে জেলা প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন বলে উদ্যোক্তাদের নিষেধ করে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছি।
পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জলাশয় ভরাট করা জলাধার আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। আমরা পুকুরটি ভরাটের চেষ্টার একটি অভিযোগ পেয়ে মালিকদের সতর্ক করে দিয়েছি।
