প্রধান সূচি

নাজিরপুরে পিআইও অফিসের পিওনকে ১৫% ঘুষ দিলেই মেলে কাজ !

‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় এইচবিবি প্রকল্পের ইটসলিং রাস্তা নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন কাজ পেতে প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের ১৫% টাকা আমাকে দিলেই আপনি কাজ পেয়ে যাবেন। আমার প্রয়োজন টাকা আর আপনার প্রয়োজন কাজের। কিভাবে আপনাকে কাজ পাইয়ে দিতে হবে সেটা আমার উপর ছেড়ে দিন। লটারী করবো আমরা কিভাবে আপনাকে কাজ পাইয়ে দিবো সেটা বুঝবো আমি। তাছাড়া আপনি যে ১৫% টাকা দিবেন তার ৫% টাকা দিতে হবে জেলা অফিসে, ৫% টাকা ইউএনও, ৩% টাকা পিআইও এবং বাকী ২% টাকা পাবো আমি। এভাবেই সবাইকে ম্যানেজ করে কাজ করা হবে। এ নিয়ে আপনাকে কোন টেনশন করতে হবে না, আপনার পছন্দ অনুযায়ী ২ নম্বর গ্রুপের কাজটিই আপনাকে দেয়া হবে। তবে আসল কথা হলো আগামী ১৯ নভেম্বর মঙ্গলবার লটারী হবে এর আগেই হিসেব অনুযায়ী এক গ্রুপের জন্য আপনাকে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দিতে হবে। তাহলেই আপনি কাজ পাবেন। আগে টাকা পরে কাজ, তা না হলে কাজ পাওয়ার পর যদি আপনি পল্টি নেন।’

টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী এক ঠিকাদারকে নিজ অফিসে ডেকে এভাবেই কথাগুলো অকপটে বলছিলেন নাজিরপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে অস্থায়ী ভিক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক মোহাম্মদ আলী। কথাগুলো কৌশলে অডিও রেকর্ড করেন ওই ঠিকাদার। ১০ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের ওই রেকর্ডটিই এ প্রতিনিধির কাছে রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জেল হোসেন মুঠোফোনে জানান, তিনিসহ কার্য-সহকারি শাওন হালদার এ অফিসে সরকারীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ষ্টাফ। তাছাড়া অফিস সহায়ক মোহাম্মদ আলী প্রজেক্টের মাধ্যমে অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং কোন প্রকার নিয়োগ ছাড়াই পিআইও ই¯্রাফিল তার এলাকার মনির নামের এক ছেলেকে এ অফিসে রেখে অফিস সহায়ক মোহাম্মদ আলী ও মনিরকে দিয়েই অফিসের সকল কাজ করাচ্ছেন। অফিসের একটি কক্ষে অফিসারের মতই বসেন অফিস সহায়ক আলী। অফিসের সকল ফাইলপত্র তার নিয়ন্ত্রণে থাকে। পিআইও নিজে পর্দার আড়ালে থেকে অফিস সহায়ক আলীকে দিয়েই সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করে চলছেন। পিআইও’র এ সকল কর্মকান্ড সর্মথন না করায় পিআইও ওই প্রকৌশলীকে নানাভাবে হয়রানী করে আসছেন বলেও দাবী করেন তিনি।

উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জেল হোসেন আরো জানান, পিআইও অফিসে সবচেয়ে বড় পুকুর চুরি হয় ৪০ দিনের কর্মসূচির কাজে। সাবেক এমপি এ কে এম এ আউয়ালের শেষের দিকে ৪০ দিনের কর্মসূচির কাজের পুকুর চুরির বিষয়টি অনেকটা প্রকাশ্যে আসলে বর্তমান এমপি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম মাসিক সভায় প্রকাশ্যে এ নিয়ে সকল জনপ্রতিনিধিসহ অফিসারদের কোন প্রকার অনিয়ম ও দুর্নীতি মেনে নেয়া হবে না বলে সর্তক করেন। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় দায়িত্ব গ্রহণের পরে দুই ধাপে ৪০ দিনের কর্মসূচিতে প্রায় চার কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। ওই কাজ বাস্তবায়নে পিআইও মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে নিজেকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত প্রমাণ করতে জনপ্রতিনিধিরা সঠিকভাবে কাজ করেনি বলে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ফেরত পাঠান। অবশিষ্ট টাকার কিছু কিছু কাজ করে বড় একটি অংশ কতিপয় জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে নিজেদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করে নেন। ওই কর্মসূচির লেবারদের ব্যক্তিগত ব্যাংক এ্যাকাউন্টে কাজের বিল জমা হলে লেবাররা নিজেরা টাকা উত্তোলন করবে এমন নিয়ম থাকলেও ব্যাংক ম্যানেজ করে অফিস সহায়ক আলী ব্যাংক থেকে সকল টাকা উত্তোলন করে থাকে।

তিনি আরো জানান, ৪০ দিনের কর্মসূচির এক ধাপে উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নে তিনটি প্রকল্পে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তিনজন ইউপি সদস্য ওই তিনটি প্রকল্পের সিপিসি থাকেন। পিআইও’র নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কিছু কিছু কাজ করলে তাদেরকে দেড় লাখ টাকা করে এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দেন পিআইও ই¯্রাফির। বাকী টাকা তিনি তার সিন্ডিকেটসহ আত্মসাৎ করেছেন। এভাবেই সুকৌশলে তিনি অনিময় ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন।

পিআইও এবং অফিস সহায়ক আলী লটারী কারসাজির মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ত্রাণের ব্রীজ ও কালভাট পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে পাইয়ে দিয়ে পরে নিজেরাই ওই কাজ বাস্তবায়ন করে থাকেন। অর্থাৎ নানা কৌশলে তারা নাজিরপুর উপজেলায় চাকুরী করেও নিজেরাই ঠিকাদারী করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ই¯্রাফিল বরগুনার আমতলী উপজেলায় কর্মরত থাকাকালীন অফিস সহায়ক হিসেবে সেখানে যোগদান করেন মোহাম্মদ আলী। সেখান থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পিআইও ই¯্রাফিলের নাজিরপুরে বদলী হলে তিনি তদবির করে অফিস সহায়ক মোহাম্মদ আলীকেও নাজিরপুরে নিয়ে আসেন।

এছাড়া অফিস সহায়ক মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ত্রানের ঘর দেয়ার নামে উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন থেকে ঘর প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে লাখ লাখ টাকা আদায় করারও সুনিদিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কথা হলে পিআইও অফিসের অফিস সহায়ক মোহম্মদ আলী এ প্রতিনিধিকে বলেন, বাস্তবতা হলো আমার কাউকে কাজ পাইয়ে দেয়ার ক্ষমতা  নেই। ওই ঠিকাদারের সাথে আমার যে কথাগুলো হয়েছে তা আমি রহস্য করে বলেছি। সে কথাগুলো তিনি রেকর্ড করে আমাকে বিপদে ফেলবে তা আমি বুঝতে পারিনি। তাছাড়া আমি আমার অফিসের বসদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে এখানে আমার কিছু করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ই¯্রাফিল তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো ভিক্তিহীন অভিযোগ। এর কোন সত্যতা নেই। তাছাড়া অফিস সহায়ক আলীর বিরুদ্ধে ১৫% টাকা গ্রহণ করে ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অডিওটি আমি শুনেছি এবং কথাগুলো আলীর বলে আমি সনাক্তও করেছি। এ ঘটনায় তাৎক্ষনিকভাবে তাকে লিখিত ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। সে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial