কেজিতে ৩শ টাকা কম, রপ্তানিতে মন্দা
বাগেরহাটে গলদা চিংড়ির দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে ৪৩ হাজার চাষি
মোঃ কামরুজ্জামান, বাগেরহাট থেকে :
বাগেরহাটে সাদা সোনাখ্যাত গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে ৩শ টাকার বেশি কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার ৪৩ হাজার চিংড়ি চাষি। আর এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন আমদানিকারক দেশগুলোয় অর্থনৈতিক মন্দার কারণেই এ অবস্থার জন্য দায়ী। এদিকে গলদা চিংড়ির দাম কমে যাওয়া অন্যদিকে কিছুদিন আগে অতিবৃষ্টিতে চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ার কারনে চড়ম হতাশায় ভুগছেন চাষিরা। অনেকেই চাষি আবার ব্যাংক, এনজিও ও মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে চিংড়ি ঘের করেছিলেন। এখন সব মিলিয়ে জেলার চিংড়ি চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, বাজারে গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে চাষিরা। এর আগে অতিবৃষ্টিতে প্রায় ১১ হাজার ঘের ভেসে ও বাগদা চিংড়িতে ভাইরাস সংক্রমণেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিভিন্ন দেশে রপ্তানির জন্য চিংড়িগুলোকে বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পঞ্চম গ্রেডের বর্তমান দর ৭৫০ টাকা যা মাস তিনেক আগে ছিল ১১০০ টাকা। আর ১০ গ্রেডের দাম ৯৫০ টাকা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৬৫০ টাকায়। আর এ কারনেই জেলার অধিকাংশ চিংড়ি চাষীরা ঘের থেকে চিংড়ি ধরা বন্ধ রেখেছেন।
বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের শ্রীঘাট গ্রামের চিংড়ি চাষী শেখ লিয়াকত আলী বলেন, আমার পাঁচ বিঘার একটি চিংড়ি ঘের রয়েছে। রেণুর দাম, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এ বছর আমার খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। চিংড়ি বিক্রির মৌসুম শুরু হলেও এখনও ২০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করতে পারিনি। হঠাৎ বাজার পড়ে যাওয়ায় মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। লাভ তো দূরের কথা এ বছর আসল উঠা নিয়েই শঙ্কায় আছি।
জেলার কচুয়া উপজেলার বিলকুল গ্রামের আব্দুল বারেক পাইক জানান, ১২ বিঘা জমিতে ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঝণ নিয়ে গলদা চাষ করেছিলাম। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। মৌসুম শুরু হলেও দাম পড়ে যাওয়ায় মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। বাজার এ রকম থাকলে ঋনের টাকা কিভাবে পরিশোধ করবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি।
সদর উপজেলার বারাকপুর মৎস্য আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন জানান, এজেন্টরা আমাদের যেভাবে বুঝান সেভাবেই চিংড়ির বাজারটা চলছে। দাম বাড়া-কমায় সরকারের মৎস্য বিভাগের তদারক না থাকায় তারা এ সুযোগটি নিচ্ছে। তিনি চিংড়িশিল্প বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান।
বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের প্রায় আশি ভাগ মানুষ চিংড়ি চাষের সাথে জড়িত। অনেক চাষীই ব্যাংক, এনজিও ও মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঝণ নিয়ে চিংড়ি চাষ করে থাকেন। চলতি মৌসুমে অতি বৃষ্টিতে জেলার প্রায় এগারো হাজার চিংড়ি ঘের ভেসে চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এর কিছুদিন আগে বাগদা চিংড়িতে ভাইরাসের সংক্রমণে চাষীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তারপর বাজারে গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ টাকা কমে গেছে। সব মিলিয়ে এই জেলার চাষীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে বাগদা ও গলদা চিংড়ির দাম ওঠানামা করছে। সরকারের নজরদারির অভাবে গত কয়েক বছর ধরে চাষীরা আর্থিকভাবে সর্বশান্ত হচ্ছেন। সরকার যদি কার্যকরি পদক্ষেপ না নেয় তাহলে এই চিংড়ি শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশংকা তার।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া হায়দার জানান, জেলার প্রায় ৪৩ হাজার চাষি প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করেন। দাম পড়ে যাওয়া সবাই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। যুক্তরাজ্যসহ আমদানিকারক দেশগুলোয় অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চিংড়ির দাম পড়ে গেছে বলে আমাদের দেশের রপ্তানিকারকরা দাবি করছেন। এছাড়া বছরের এ সময়টায় চাষিরা ঘের প্রস্তুত করার জন্য সব চিংড়ি ধরে বিক্রি করে দেন। রপ্তানিকারকরা মাছের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার এ সুযোগটা অনেক সময় নিয়ে থাকে। তবে চিংড়ির দাম আবার আগের জায়গায় ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।
