প্রধান সূচি

ঘর নেই, খাবার নেই

মাথার চুল বিক্রি করে ঘরভাড়া দিলেন অসহায় মা

একজন নারীর কাছে মাথার চুল শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, আত্মমর্যাদা ও সাজসজ্জারও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া কিংবা মাথার ওপর একটি ছাদ নিশ্চিত করার তাগিদে মায়ের কাছে নিজের সৌন্দর্যও যখন তুচ্ছ হয়ে যায়, তখন সেই ত্যাগের গভীরতা বোঝা যায়। বাগেরহাটের রামপালে দুই সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে এমনই এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন রেহানা খাতুন।
দারিদ্রেরে কষাঘাতে ঘর হারিয়ে এখন খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে রেহানা খাতুন ও তার দুই সন্তানের। একসময় ভাড়া করা একটি ঝুপড়ি ঘরে থাকলেও দীর্ঘদিন ভাড়া দিতে না পারায় সেই আশ্রয়ও হারাতে হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫০০ টাকা ঘরের ভাড়া পরিশোধ করতে মাথার চুল বিক্রি করতে হয়েছে এই অসহায় মাকে। ঘটনাটি রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেহানা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনের মধ্যে দুই সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে দিন পার করছিলেন। মাথা গোঁজার স্থায়ী জায়গা না থাকায় কখনো পরিচিতদের বাড়িতে, আবার কখনো ভাড়া করা ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নিতেন। কিন্তু সামান্য সেই ভাড়াও পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ঘর ছাড়তে হয় তাকে। বর্তমানে রেলব্রিজের পাশে সরকারি জমিতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘর তৈরির চেষ্টা করছেন রেহানা। কয়েক মাস ধরে সেখানে বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও অভাবের কারণে ঘরটি আর সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ফলে প্রখর রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন দেখি তার মাথায় চুল নেই। কারণ জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে জানান, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে তিনি নিজের চুল বিক্রি করেছেন।
সন্তোষপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা তালেব শেখ বলেন, রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। তার স্বামী দুই সন্তানসহ তাকে ফেলে চলে গেছেন অনেক আগে। আমরা গ্রামবাসি সরকারের কাছে দ্রæত অসহায় এই পরিবারটিকে একটি ঘরের ব্যবস্থাসহ সহযোগীতা করার দাবী জানাই।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁশের কাঠামো তৈরি আছে। এখন শুধু টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে পারলেই ঘরটি সম্পূর্ণ করা যাবে। এলাকার সচ্ছল মানুষ ও প্রশাসন এগিয়ে এলে অসহায় পরিবারটির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব।
রেহানার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া বিলাসবহুল কোনো ঘর নয়। দুই সন্তানকে নিয়ে বৃষ্টির রাতে যাতে ভিজতে না হয়, রোদে যাতে পুড়তে না হয় এবং রাতে যাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, এমন একটি ছোট্ট টিনের ঘরই তার স্বপ্ন।
কান্নাজড়িত কন্ঠে রেহানা খাতুন বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। ঘর নেই, খাওয়ার কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই।
রেহানার এই গল্প শুধু একজন অসহায় নারীর গল্প নয়, এটি দারিদ্রের নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। যে মা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সৌন্দর্য বিসর্জন দিতে পারেন, সেই মায়ের কাছে আজও একটি নিরাপদ আশ্রয় অধরা। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রæত রেহানার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহŸান জানিয়েছেন তারা।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ খবর নিয়ে অসহায় ওই নারী ও তার সন্তানদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial