প্রধান সূচি

কারখানার ধোঁয়া-শব্দে বিপন্ন ৯১ পরিবারের বসতি

একদিকে ভৈরব নদী, অন্যদিকে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প। নদীর তীরে ৯১টি ঘরে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বসবাস করছেন এসব পরিবার। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পাশের চাপাতলা গ্রীন বোর্ড অ্যান্ড ফাইবার মিলসের ধোঁয়া, তীব্র দুর্গন্ধ, শব্দ ও রাসায়নিক কণায় সেই জীবন এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এতে মানুষের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভৈরব নদী ও আশপাশের পরিবেশও-এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চাপাতলা গ্রামের ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিন গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।বাসিন্দাদের দাবি, কারখানাটি চালুর পর থেকেই এলাকার পরিবেশের চিত্র বদলে গেছে। কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও ধোঁয়া ও গন্ধ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। বাতাসের সঙ্গে সূক্ষ্ম কণার মতো পদার্থ এসে ঘরবাড়ি, উঠান, কাপড়চোপড় ও আশপাশের ঘাসে পড়ে বলেও অভিযোগ তাদের শুধু ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ নয়, কারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় কারখানার কার্যক্রম চলায় আশপাশের বসতিতে শব্দের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে শিশু ও বয়স্কদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানার তরল বর্জ্য ভৈরব নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে নদীর পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আগের তুলনায় মাছও কমে গেছে। কোথাও কোথাও মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি তাদের।
তবে কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশছে কি না কিংবা এতে নদীর পানি ও মাছের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা এখনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়নি। স্থানীয়রা নদীর পানি, মাটি ও বর্জ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।
গ্রামের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতের বেলা তো চোখেই দেখা যায় না। বিশেষ করে যে গন্ধটা হয়, একবার নারিকেল তেলের মতো, আবার একবার গুড়ের মতো। এখানে থাকাই দুষ্কর হয়ে গেছে। রাতে ধোঁয়া ও ধুলায় নাক-মুখ জ্বলে। তিন-চার ধরনের গন্ধ পাওয়া যায়। নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা জানি না এই ধোঁয়ার মধ্যে কী আছে। কিন্তু দিনের পর দিন এমন পরিবেশে থাকলে মানুষের শরীরে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। এখন থেকেই ব্যবস্থা না নিলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরেক বাসিন্দা বলেন, এই কোম্পানির কারণে অনেকের বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা হচ্ছে। চোখ, নাক ও মুখ জ্বালা করে। অনেকের খিঁচুনি ওঠে, নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, এখানে ৯১টি পরিবার রয়েছে। পরিবেশের এই অবস্থার কারণে অনেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আমরা চাই না কারও কর্মসংস্থান বন্ধ হোক। আমরা শুধু চাই, কারখানা চলুক; কিন্তু মানুষের ক্ষতি না করে।
আরেক বাসিন্দা বলেন, নদীতে মাছ মরে যাচ্ছে। মাসুম বাচ্চারা ঘুমাতে পারছে না, লেখাপড়া করতে পারছে না। ধোঁয়ার কারণে বাইরে বের হওয়া যায় না। এত বড় অশান্তির মধ্যে মানুষ বসবাস করতে পারে না।
কারখানার ধোঁয়া ও রাসায়নিক কণার কারণে গবাদিপশু মারা যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দা।
তিনি বলেন, গত বছর ১০টা ছাগল মারা গেছে, দুইটা গরুর বাছুরও মারা গেছে। আমার ঘরটা সবার আগে, তাই সমস্যাটাও আমার বেশি। ঘরের ভেতর কাপড়-চোপড় কিছুই রাখা যায় না। খাটের ওপর রাতে শুতে গেলে বিছানায় কেমিক্যালের গুঁড়া পড়ে থাকে। চোখ-মুখ জ্বলে যায়। বাতাসে কেমিক্যাল উড়ে এসে ঘরের মধ্যে পড়ে।
তিনি আরো ও বলেন, আমরা গরিব মানুষ। সরকার ঘর দিয়েছে থাকার জন্য। কিন্তু আমরা যদি এখানে গরু-ছাগল পুষে খেতে না পারি, তাহলে কীভাবে বাঁচব?
সরেজমিনে দেখা যায়, ভৈরব নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় ৫০ একর জমির ওপর কারখানাটি স্থাপিত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন স্থানে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে ২০২০ সালে যাত্রাপুরে কারখানাটির কার্যক্রম শুরু হয়।স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় বড় গাছের গুঁড়ি ও ছোট গাছের কাঠ মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে বোর্ড তৈরি করা হয়। কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বোর্ড তৈরির সময় শব্দ, ধোঁয়া ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে বায়ু ও শব্দদূষণ হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
কারখানায় ব্যবহৃত কাঠের উৎস, গাছ কাটার বৈধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কারখানার দূষণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
তিনি বলেন, বেশি কথা বললে মেরে ফেলার ভয়ও আছে। তাদের ওপর মহলে অনেক হাত আছে বলে আমরা শুনি। এলাকায় শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এরপরও কেউ কিছু লিখলে বা কথা বললে তার মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তবে কাউকে ভয় দেখানো, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো কিংবা কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাপাতলা গ্রীন বোর্ড অ্যান্ড ফাইবার মিলসের কো-অর্ডিনেটর গোলাম কিবরিয়া মিন্টু বলেন, এতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি নেই। এটি অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব একটি প্রজেক্ট। গাছের যে ওয়েস্টেজ আমরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি, সেটিকে প্রক্রিয়াজাত করে পার্টিকেল বোর্ড তৈরি করা হয়। এসব পণ্য দেশ-বিদেশে রপ্তানি করা যায়।
তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের ডিলার আছে, তারা এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে। যেহেতু এটি ফায়ারউড, তাই আমরা সেটিকে প্রসেসিং করে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছি। আসলে এটি গাছের বিকল্প কাঠ। অর্থাৎ এর মাধ্যমে গাছও রক্ষা করা সম্ভব।
বাগেরহাট পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসাদুর রহমান বলেন, যাত্রাপুরে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, ন্যাচারাল ফাইবার অ্যান্ড মিলস। আমরা সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করব। এর আগে আমাদের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল, পরে তারা অভিযোগটি তুলে নেয়। আবার অভিযোগ পেলে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো।
তিনি আরও বলেন, বাতাসে ধোঁয়ার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়রা বলেন, তারা শিল্পকারখানা বন্ধের পক্ষে নন। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্প প্রয়োজন, তবে মানুষের জীবন ও পরিবেশের ক্ষতি করে নয়। তাদের দাবি, কারখানার ধোঁয়া, শব্দ ও বর্জ্য নির্গমন ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখা হোক। পাশাপাশি ভৈরব নদীর পানি ও আশপাশের পরিবেশের নমুনা পরীক্ষা এবং গবাদিপশুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা হোক। তাদের প্রশ্ন, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসনের জন্য সরকার যে ঘর দিয়েছে, সেখানে যদি নিরাপদে বসবাসই করা না যায়, তাহলে এসব মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়?

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial