বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় না …… ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ
সাইফুল্লাহ হুমায়ুন :
পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ এখন আর বিশ্বে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় না।
আমাদের দেশ এখন উন্নয়ন শীল দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এদেশের মানুষ আর না খেয়ে মারা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে পদার্পন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাম্প্রতিক ভারত সফরের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে বলেছিলেন বাংলাদেশ এখন তাদের দেশের চেয়েও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনেরও মন্তব্য সামাজিক সূচকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের চেয়ে উপরে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়ার চরখালীতে এক বিরাট জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভান্ডারিয়ায় পোল্ডার ৩৯/২সি এর বেড়ি বাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণ এবং খাল পুনর্খনন ও নদী তীর সংরক্ষণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বীরপ্রতীক বিশেষ অতিথি ছিলেন। প্রধান বক্তা ছিলেন পিরোজপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মহিউদ্দিন মহারাজ।
ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আরও বলেন, এ দেশে কোন মানুষ খাদ্যাভাবে আত্মহত্যা করেন না। অথচ সংবাদপত্রে দেখা যায় পাশের দেশে কৃষকরা ফসলহানির কারণে আত্মহত্যা করছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান না কোন মানুষ না খেয়ে কষ্ট পান, তাই তিনি নানা ভাতাসহ বিভিন্ন পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করেছেন। আমরা আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছি বলে দেশে এই পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থেকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হবে। পানি সম্পদ মন্ত্রী বলেন, ৩০ বছর আগে আমি আরেকবার ভান্ডারিয়ায় এসেছিলাম। তখন এই জনপদের যে অবস্থা দেখে গেছি আজ এখানে এক বিশাল পরিবর্তন দেখে আমি অভিভূত। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তাঁর এলাকাকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছেন তা সম্ভব হয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে একজন মানুষ হিসাবে জনগণকে নেতৃত্ব দেয়া। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে উন্নয়ন এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। যার প্রতিফল আজ আমি ভান্ডারিয়ায় দেখতে পাচ্ছি।
মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা উপকূল এলাকায় আগামী কয়েকটি প্রজন্মের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ৬০/৭০ বছর টিকে থাকে এ ধরণের বেড়ি বাঁধ নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছি। জলবায়ূ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে কৃষি ফসল জোয়ারের পানি ও লবাক্তার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এখানে বেড়ি বাঁধের মাঝে টেকসই স্লুইস গেট নির্মিত হবে, খাল খনন, পুনর্খনন, বাঁধের ঢাল প্রতিরক্ষা কাজ, নদীর তীর সংরক্ষণ, বন প্রতিরোধ কংক্রিট ওয়াল নির্মাণ, ক্লোজার নির্মাণসহ বাঁধের উপর রাস্তা নির্মাণ কাজও হবে। ভান্ডারিয়ার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে বেড়ি বাঁধ নির্মাণে ৪৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। অথচ বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল ৫০০ কোটি টাকা। পানি সম্পদ মন্ত্রী ভান্ডারিয়া বাসিকে আশ্বস্ত করে বলেন, বেড়ি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে কোন অর্থের সমস্যা হবে না। প্রকল্পের কারণে যাদের ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে সে সব গ্রামবাসী দ্রুততার সাথেই তাদের ক্ষতিপূরণ পাবেন। তিনি পার্শ্ববর্তী ইন্দুরকানী উপজেলার কঁচানদী তীরবর্তী বেড়ি বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ কল্পে ৫০ কোটি টাকার অনুদান ও কাউখালী উপজেলার সন্ধ্যানদীর তীর সংরক্ষণের জন্য অচিরেই একটি প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয়পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, উন্নয়নের কোন শেষ নেই। একবার কাজ শুরু হলে তার ধারা চলতেই থাকে। পৃথিবীর সর্বত্র এর উদাহরণ রয়েছে। আমরা বলি উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হচ্ছে অবকাঠামোগত নির্মাণ। আজ গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতায়ন হচ্ছে। আমি সবসময় সর্বত্র বলেছি স্বাধীনতার পূর্বে আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল ভিন্ন চরিত্রের, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। আজকের আন্দোলন হচ্ছে সকলে মিলে কাজ করতে হবে, ৩০ বছর ধরে বলে এসেছি সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। আমাদের দেশ একটি আধা সামন্তবাদী দেশ। এই মানসিকতা ও অভ্যাস দূর করে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য ঐক্য ছাড়া উপায় নেই। দেশ-বিদেশে মানুষের ধারণা ভান্ডারিয়া একটি শান্তির জায়গা-ঐক্যের জায়গা। এখানকার মানুষ অর্জন ও প্রাপ্তির জন্য মিলে মিশে থাকে। আজ যে বেড়ি বাঁধ নির্মাণের বিরাট প্রকল্প শুরু হলো তা এই ধারণারই ফসল। আমরা চলে গেলেও ভবিষ্যতে আমাদের অনুপস্থিতিতে ভান্ডারিয়ায় নেতৃত্বের শূণ্যতা সৃষ্টি হবে না।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বীরপ্রতীক বলেন, বাংলাদেশ আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলছে। সঠিক নেতৃত্বের কারণে বাঁধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তাঁরই নির্দেশে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। যেমন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। আমাদের দেশ আর পৃথিবীর কাছে অনুন্নত দেশ নয়। আমরা বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতা নই, উন্নয়নের সহযোগী। সিডর-আইলার মত অভিশাপ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে ভান্ডারিয়াসহ উপকূল অঞ্চলে ৩২’শ কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়ি বাঁধ নির্মাণের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ এলাকার নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দক্ষিণাঞ্চলের সিংহ পুরুষ। তিনি মন্ত্রী হলে শেখ হাসিনার হাত শক্তিশালী হয়, দেশ শক্তিশালী হয়।
প্রধান বক্তা পিরোজপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, আমি পিরোজপুর পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি, জেলা
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, কিন্তু আমার সৃষ্টি পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র হাতে। আজ ভান্ডারিয়ার যত উন্নয়ন হয়েছে তার সকল অবদান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। আমরা গত সিডর ও আইলার সময় আমরা উপলদ্ধি করেছিলাম যে আমাদের এলাকায় বেড়িবাঁধের কত প্রয়োজন। বর্তমানে যে প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে সেটি সম্পর্ন্ন হলে এলাকার মানুষের বন্যা, জলোচ্ছাসে তলিয়ে যাবার কোন ভয় থাকবে না।
তিনি বলেন, ৪৫৬ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে উপকুলীয় উপজেলা ভান্ডারিয়া এলাকায় ৬০ কিলোমিটার বেড়ী বাধ নির্মান, খাল খনন, স্লুইচ গেট নির্মান, বাঁধের ঢাল প্রতিরক্ষা কাজ, নদী তীর সংরক্ষণ কাজ, বন্যা প্রতিরোধ কনক্রিট ওয়াল নির্মান, বাঁধ এবং রাস্তাক্রসিং বাঁধ এর উপর পাকা রাস্তা নির্মান করা হবে। তবে প্রকল্পের কাজের জমি অধিগ্রহণ করে কাজ শুরু করতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমরা সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত কাজ শুরু করতে চাই। সে লক্ষে জমির মালিকদের ঝমি অধিগ্রহনের আগেই কাজ করতে দিতে হবে। বাধা দিলে কাজ বিলম্বিত হবে। এ সময় মহিউদ্দিন মহারাজ এলাকাবাসীকে, জমির মালিকদের সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের সহযোগিতা করার জমি অধিগ্রহনের আগেই প্রকল্পের জন্য জমি দিতে আহবান জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক মোঃ দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে জনসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফাইজুর রশীদ খসরু, টুঙ্গীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রশীদ তারিক, ভান্ডারিয়া উপজেলা জাতীয় পার্টি (জেপি) সদস্য সচিব ও ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ইকড়ি ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান চৌধুরী ও ইন্দুরকানীর পত্তাশী ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর কবির, বিশ্ব ব্যাংকের কর্মকর্তা স্বর্ণা কাজী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পশ্চিম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান, অতিরিক্ত মহা পরিচালক মাহাফুজুর রহমান, পিরোজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম সোহরাব হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমেদ মাঈনুল হাসান, ভান্ডারিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা জেপি’র আহ্বায়ক মনিরুল হক জোমাদ্দার মনি, কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আহসান কবির, ভান্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিন আক্তার সুমী, ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তারসহ এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানবৃন্দ।
এর আগে পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু চরখালীর কঁচানদীর তীরে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় তাঁরা দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন।
