প্রধান সূচি

চাকুরী জাতীয়করণের দাবীতে আন্দোলনে সিএইচসিপিরা

ব্যাহত হচ্ছে পিরোজপুরের গ্রামীন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রাখা কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম

পিরোজপুরে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জেলার ১৫৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক। ক্লিনিকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এসব ক্লিনিকে কর্মরত গরীবের ডাক্তারখ্যাত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)দের। যোগদানের পর হতে একই বেতন-ভাতা উত্তোলন করছে তারা। গত ৭ বছরেও চাকুরি জাতীয়করণ না হওয়ায় যেমন বাড়েনি বেতন-ভাতা তেমনি সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে তারা। ইতোমধ্যে কয়েক দফা উদ্যোগ নেয়া হলেও চিঠি চালাচালীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে জাতীয়করণের বিষয়টি। শেষমেষ জাতীয়করণের দাবীতে সংশ্লিষ্ট হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা পালন করছেন অবস্থান কর্মসূচি।

দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে পিরোজপুরে আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জেলা সিভিল সার্জন অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে সিএইচসিপিরা। কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য রাখেন, সিএইচসিপি এসোসিয়েশনের জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মো. বনি আমীন, সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন শেখ, সাংগঠনিক সম্পাদক আরাফাত রহমান খান, সদস্য খলিলুর রহমান, মোস্তফা তালুকদার, সুজন বিশ^াস, অসিম কুমার, আতিক হাসান, লিনা আক্তার।

সিএইচসিপিরা চাকুরী জাতীয়করণের দাবী জানিয়ে এদিন সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও পেশ করেন।

এর আগে গত ২০, ২১ ও ২২ জানুয়ারী তারা জেলার ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি পেশ করে।

সিএইচসিপিদের চাকুরী জাতীয়করণ (রাজস্ব করণ) না করা হলে ২৪, ২৫ ও ২৬ জানুয়ারী কর্মবিরতির ঘোষনা দিয়েছে। এছাড়া ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ২৭ জানুয়ারী থেকে ৩১ জানুয়ারী পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচিসহ ১ ফেব্রুয়ারী থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচির ঘোষনা দিয়েছে।

সিএইচসিপিদের কর্মবিরতি ও দাবী আদায়ের কর্মসূচির ফলে গত কয়েকদিন ধরে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম।

সূত্র মতে, মানুষের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা, মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দিতে বর্তমান সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেন। অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ২০০১ সাল পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে স্থবির হয়ে পড়ে এর সকল কার্যক্রম। ২০০৮ সালে আবারও ক্ষমতায় এসে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বন্ধ থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরু করেন। ক্লিনিকগুলো সচল রাখা ও সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১১ সালে প্রত্যেক কমিউনিটি ক্লিনিকের বিপরীতে নিয়োগ দেয়া হয় একজন করে হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)। এর মাধ্যমে পুরোপুরি চালু হয় গ্রামীন এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম।

পিরোজপুর জেলার ৭টি উপজেলার ৫২টি ইউনিয়নে প্রস্তাবিত ১৬৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে নির্মান করা হয় ১৫৯টি ক্লিনিক। বর্তমানে এসব ক্লিনিকের মধ্যে ১৪০টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ১৪০ জন সিএইচসিপি কর্মরত আছেন। বাকীগুলোতে সিএইচসিপি না থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। জেলার প্রায় ১৪ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি কর্মরত হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের।

জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার মধ্য ভবানীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. খানজাহান সিকদার বলেন, ‘এমন কোন চিকিৎসা সেবা নেই যা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দেয়া হয় না। সেবা করার মাধ্যমে গত ৭ বছরে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে গরীবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। কিন্তু সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা থেকে আমরা এখনো বঞ্চিত রয়েছি। যোগদানের পর হতে এ পর্যন্ত একই বেতন-ভাতা উত্তোলন করছি। তাও আবার সময়মত পাইনা। অনেক সময় ৬ মাস পর পর বেতন পাই। এতে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতন জীবন যাপন করতে হচ্ছে।’

নাজিরপুর উপজেলার শাখারীকাঠী ইউনিয়নের বেকারখাল কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে নিয়েজিত সিএইচসিপি মো. আরাফাত খান বলেন, ‘সিএইচসিপিদের চাকুরী জাতীয়করণের বিষয়ে হাইকোর্টর নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও চাকুরী জাতীয়করণ করা হচ্ছে না। তাই আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের দাবী না মানা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।’

জানা গেছে, সিএইচসিপিদের চাকুরি জাতীয়করণের ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও তা চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক ডা. মাখদুমা নার্গিস ২৯/০৭/২০১৩ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবাদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখাসহ সিএইচসিপিদের চাকুরী রাজস্ব খাতে স্থানান্তর প্রসঙ্গে সকল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর পত্র প্রেরণ করেন। এরপর ১৯/০৯/২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. শাহ নেওয়াজ সিএইচসিপিদের চাকুরী স্থায়ীকরণ প্রসঙ্গে সকল সিভিল সার্জন বরাবর পত্র দেন। পরে ১৭/০৪/২০১৪ সালে ডা. মাখদুমা নার্গিস আবারও সিএইচসিপিদের চাকুরী বহিঃ খোলা প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন বরাবর পত্র দেন। এরপর ২২/০৪/২০১৪ তারিখ ডা. মাখদুমা নার্গিস আবারও সিএইচসিপিদের হালনাগাদ বার্ষিক/বিশেষ গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) প্রেরণ প্রসঙ্গে সকল সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর পত্র দেন। এভাবেই শুধু পত্র প্রেরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে জাতীয়করণের কার্যক্রম।

কর্ম বিরতি ও আন্দোলনে থাকা সিএইচসিপিরা জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এর মধ্যে সাধারণ রোগী সেবা, বাচ্চাদের শুন্য থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সেবা, গর্ভবতী মায়েদের ডেলিভারী সেবাসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা রয়েছে। ওষুধ দেয়া হয় ৩০ প্রকারের। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এসব স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়। আর রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে রেফার করার জন্য বলা হয়। পাশাপাশি সব ধরনের পরামর্শমূলক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়।

বাংলাদেশ কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার এসোসিয়েশনের পিরোজপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন সেখ বলেন, ‘গর্ভবতী মায়ের সেবা, শিশু স্বাস্থ্য, স্বাভাবিক প্রসব, স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদানসহ সাধারণ রোগের চিকিৎসা সেবায় সিএইচসিপি’রা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে সিএইচসিপিরা। অথচ যাদের মাধ্যমে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হচ্ছে তারাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। যারা কর্মরত রয়েছি তাদের অনেকের ইতোমধ্যে চাকুরীর বয়স শেষ। সরকার রাজস্ব খাত থেকে আমাদের বেতন প্রদান করলেও চাকুরী জাতীয়করণের ব্যাপারে তেমন কোন অগ্রগতি নেই। ফলে আমরা সবাই সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত রয়েছি। সুষ্ঠু স্বাস্থ্যসেবার কর্মপরিবেশ, উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার স্বার্থে এবং দেশের তৃণমূল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিরস্থায়ী রূপদানের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য বান্ধব সরকার দেশের সকল সিএইচসিপিদের চাকুরী জাতীয়করণ করার মাধ্যমে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।’

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial