প্রধান সূচি

শরিয়তসম্মত বিনিয়োগের নামে এহসান গ্রুপের প্রতারণা

ধর্মপ্রাণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে ওয়াজ মাহফিল ও আলেমদের ব্যবহার করতেন মাওলানা রাগীব

শরিয়তসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগে উচ্চ মুনাফা দেওয়ার নামে প্রতারণা ও জালিয়াতিতে অভিনব পন্থা বেছে নিয়েছিলেন এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান মুফতি মাওলানা রাগীব আহসান। দেশ-বিদেশের আলেমদের দিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াজের আড়ালে প্রচারণা চালাতেন তিনি। দুই দফায় তিনি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আলেম এনে এহসান গ্রুপের পক্ষে প্রচারণা চালান। এছাড়া দেশের পরিচিত বেশ কয়েকজন ইসলামী বক্তাও ওয়াজের নামে এহসান গ্রুপের প্রচারণায় অংশ নেন। ধর্মকে ব্যবহার করে এভাবেই তিনি সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাগীব আহসান এসব তথ্য জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তোপখানা এলাকা থেকে রাগীব আহসান ও তার ভাই আবুল বাশার খানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে শনিবার তাদের পিরোজপুর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অন্যদিকে, পিরোজপুরের পুলিশ গত বৃহস্পতিবার রাগীবের আরও দুই ভাই মাহমুদুল হাসান ও খায়রুল ইসলামকে তাদের খলিশাখালী গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। তারা দু’জনই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সদস্য। তাদের মধ্যে মাহমুদুল পিরোজপুর বাজার মসজিদের ইমামের দায়িত্বও পালন করছিলেন।
গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পিরোজপুর থানায় রাগীব, তার ভাই ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। আরও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
এদিকে রাগীবকে গ্রেপ্তারের পর তার নানা প্রতারণার তথ্য বের হয়ে আসছে। ফেসবুকে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াজের বেশ কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে ওয়াজকারীদের এহসান গ্রুপে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাতে শোনা যায়।
একটি ওয়াজে মাওলানা হাফিজুর রহমান ছিদ্দিককে (কুয়াকাটা) বলতে শোনা যায়, এহসান গ্রুপ গোটা জাতির জন্য রহমত। ইসলামের হেফাজতে একটা প্রতিষ্ঠানের নাম এহসান। এত আলেমের বক্তব্য শোনার পর এই গ্রুপ নিয়ে প্রশ্ন থাকবে না। যারা আমাদের ভালোবাসবেন, তারা এহসান নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না। শুধু জানার থাকলে প্রশ্ন করতে পারেন। আপনারা জানেন, সুদের গুনাহ হলো মায়ের সঙ্গে জেনা করার সমতুল্য। গুনাহ থেকে হেফাজতের জন্য আমার বন্ধুবর প্রাণের টুকরো এহসান এটা চালু করেছেন। আমিও এহসান পরিবারের একজন সদস্য। তিনি বলেন, এহসান গ্রুপকে যারা বিশ্বাস করবে না, তারা মুনাফেক।
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের জানান, সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনে রাগীব তার প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করতেন। বিদেশ থেকে ধর্মীয় বক্তাদের এনে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বক্তব্য দেওয়াতেন তিনি। সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করে তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। এভাবে তার প্রতারণার জাল বড় করতে থাকেন।
র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, রাগীব প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ দিয়ে তিনি আবাসন ব্যবসা ও জমি কেনায় বিনিয়োগ করেছেন। এ ধরনের সাত-আটটি প্রকল্প থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, হাজার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া টাকা কোথায় রেখেছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি রাগীব। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তার টাকার বড় একটা অংশ বিদেশে পাচার হতে পারে। রাগীবকে জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্নিষ্ট র‌্যাবের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, তিনি একটি ক্যাডেট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অবৈধ ফান্ড এনেছেন। তিনি সন্দেহজনকভাবে বারবার সৌদি আরব, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন বলে তথ্য মিলেছে। ২০০৮ সালে তার প্রতিষ্ঠানটি চালুর পর স্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী পঞ্চম শ্রেণি পাস হওয়ায় অধিদপ্তর তাকে সে সময়ে নিবন্ধন দেয়নি বলে রাগীব জানিয়েছেন। রাগীব হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে পাস করেন। পরে খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে মুফতি ডিগ্রি নেন।
পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. মাসুদুজ্জামান জানান, রাগীব ও তার ভাই বাশারকে র‌্যাবের কাছ থেকে তারা গ্রহণ করে পিরোজপুরে নিয়ে এসেছেন। তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। রাগীগ ও তার অপর তিন ভাই বর্তমানে পিরোজপুর কারাগারে আছেন। রবিবার আদালতে তাদের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকা থেকে ওই দু’জন গ্রেপ্তার হলেও পিরোজপুরের পুলিশ গত বৃহস্পতিবারই রাগীবের অপর দুই ভাই মাহমুদুল হাসান ও খায়রুল ইসলামকে তাদের খলিশাখালী গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। তারা দু’জনই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সদস্য। তাদের মধ্যে মাহমুদুল পিরোজপুর বাজার মসজিদের ইমামের দায়িত্বও পালন করছিলেন।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাগীবের বাবা মাওলানা আব্দুর রব, শ্বশুর শাহ আলমসহ তাদের পরিবার জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক। যুদ্ধাপরাধ মামলায় দন্ডিত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সঙ্গে এই পরিবারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া বিগত দিনে এহসান গ্রুপ তথা মাওলানা রাগীব আহসানের কাছ থেকে নানাবিধ সুযোগ সুবিধা নিয়ে প্রশ্রয় দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের পিরোজপুরের একটি প্রভাবশালী মহল এবং জেলা প্রশাসনের সাবেক কতিপয় কর্মকর্তা।
জানা গেছে, খলিশা গ্রামে একটি মাল্টা চাষ করা প্রকল্পের জনৈক ব্যবসায়ী হুমায়ুন আহম্মেদের সাথে একসময় মাওলানা রাগীরের সুম্পর্ক ছিল। হুমায়ুনের সাথে নানান ব্যবসায়িক সম্পর্কও তৈরী হয় মাওলানা রাগীবের। সেই সুযোগে হুমায়ুন আহম্মেদের মাধ্যমে সে সময় জেলা প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে মাওলানা রাগীব। পরে উক্ত হুমায়ুনের সাথে মাওলানা রাগীবের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে হুমায়ুন প্রতারণার মামলা করেন রাগীবের বিরুদ্ধে।
পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এহসান গ্রুপের নামে লক্ষাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে এককালীন এবং মাসিক কিস্তিতে আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে। এক লাখ টাকায় দুই হাজার টাকা করে মাসিক মুনাফা দেওয়ার নামে আমানত নেওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাগীব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ সংগ্রহ করে নামে-বেনামে সম্পত্তি ও জমি কিনেছেন। দেখা গেছে, তার শ্বশুর প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতি, বাবা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা, ভগ্নিপতি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। এ ছাড়া তার তিন ভাইও গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন।
মাওলানা রাগীব আহসান গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে ১৭টি প্রতিষ্ঠান তৈরী করে সেসব প্রতিষ্ঠানের নামেও প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেন। সেগুলো হলো- এহ্সান গ্রুপ বাংলাদেশ, এহ্সান পিরোজপুর বাংলাদেশ (পাবলিক) লিমিটেড, এহ্সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমেটেড, নূর-ই মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট একাডেমি, জামিয়া আরাবিয়া নূরজাহান মহিলা মাদ্রাসা, হোটেল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক), আল্লাহর দান বস্ত্রালয়, পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ ও ২, এহ্সান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডিং অ্যান্ড কোং, মেসার্স মক্কা এন্টারপ্রাইজ, এহ্সান মাইক অ্যান্ড সাউন্ড সিস্টেম, এহ্সান ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, ইসলাম নিবাস প্রজেক্ট, এহ্সান পিরোজপুর হাসপাতাল, এহ্সান পিরোজপুর গবেষণাগার ও এহ্সান পিরোজপুর বৃদ্ধাশ্রম। ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে-বেনামে সম্পত্তি ও জমি কিনেছেন।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial