প্রধান সূচি

পরিবার পরিকল্পনার বাজেট এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ভাবনা  

পরিবার পরিকল্পনা হচ্ছে একটি সমন্বিত জরুরি সেবা যার সাথে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং কল্যাণ। এই কর্মসূচি অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই গুরুত্ব বিবেচনায় এনে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার জনসংখ্যার উন্নয়ন বিষয়ে বিভিন্ন কৌশল ও নীতিমালা প্রনয়ণ করেছে। শুরুর দিকে, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি জনসংখ্যা প্রকল্পের মাধ্যমে চালু করা হয়। পরবর্তীতে জাতীয় জনসংখ্যা বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে ও অন্যান্য উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে সম্পৃক্ত করে সরকার পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে সামগ্রিক পদ্ধতিতে আরও বৃহদাকার করে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তরিত করে। এর প্রেক্ষিতেই, ১৯৯৮ সালে সরকার দেশি ও আর্ন্তজাতিক আর্থিক সহায়তায় স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে কয়েক বছরের কর্মসূচি, বাজেট ও কর্মকৌশল গ্রহণ করে সেক্টর ভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায়, সরকার প্রায় ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৫.৫ বছর (জানুযারি ২০১৭ থেকে জুন ২০২২) মেয়াদি চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি  সেক্টর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

চতুর্থ সেক্টর প্রকল্পের সার্বিক উদ্দেশ্য হল “সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশে সকল বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য সমান ও ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রামকে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রথম ও ভিত্তিমূল কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করছে। এই সেক্টর প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকার পরিবার পরিকল্পনা সেবা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহ প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগনের জীবনযাত্রার মান ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- নারী প্রতি গড় জন্মহার (টিএফআর) কমানো, সক্ষম দম্পতিদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি করা, সকলের জন্য পর্যাপ্ত এবং সহজলভ্য প্রজনণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা বিশেষত কিশোর-কিশোীদের জন্য পরিবার পরিকল্পনাসহ তথ্য, কাউন্সেলিং ও সেবার পর্যাপ্ততা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, মাতৃমৃত্যু হার কমানোর উপর বিশেষ জোর প্রদান করা ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়ন, সেবার সাথে জড়িত ব্যক্তি যেমন পরিকল্পনাকারী, ব্যবস্থাপক এবং সেবা প্রদানকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা ও গবেষণা ও তথ্য প্রচারের মান উন্নয়ন করা এবং সামগ্রিক পদ্ধতিতে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা।

প্রতিবছরের মতো ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে যা ২৯,২৪৭ কোটি টাকা। গত বাজেটে যা ছিল ২৫,৭৩২ কোটি টাকা। গত অর্থ বছরের তুলনায় ১৩.৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি হলেও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে জড়িত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতি বছরে বরাদ্দ বাড়লেও পরিবার পরিকল্পনা খাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যয় হচ্ছে না। যার ফলে পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছেনা। প্রস্তাবকৃত এই অর্থ স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ এই অর্থ খরচ করবে। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ হলো করোনা মহামারী মোকাবেলায় যে পরিমান অর্থ ধরা হয়েছে তা বিবেচনায় নিলে এই বছরের বজেটে সেই অর্থে কোন বাজেট বৃদ্ধি হয় নি।

আমরা যদি অধিদপ্তরের গড় ব্যয়ের হার বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২৯টি অপরেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে জানুয়ারী ২০১৭ থেকে জুন ২০২২ মেয়াদে চতুর্থ সেক্টর কর্মসূাচ বাস্তবায়ন করছে। তারমধ্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৭টি ওপি’র প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৪৯২৩.৪৮ কোটি টাকা যা সেক্টর কর্মসূচির মোট প্রক্কলিত ব্যয়ের ১১.৩২%। আলোচনায় আরো জানা যায়, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৭টি ওপি’র গড় ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৯৪.৬৪%, ৮৫.৮৬%, ৮৮.৮৭%। একই সময়ে জাতীয় ব্যয়ের গড় ছিলো যথাক্রমে ৮৯.৮৯%, ৯৪.০২% এবং ৯৪.৩৬%। বিগত তিন বছরে ৭টি ওপি’র মোট ব্যয় ছিল প্রায় ১৫৫০.৭৮ কোটি টাকা। ফলে ৭টি ওপি’র  (৪৯২৩.৪৮-১৫৫০.৭৮) = ৩৩৭২.৭০ কোটি টাকা পরবর্তী তিনটি অর্থ বছরে ব্যয় করতে হবে। চলতি অর্থ বছরের (২০১৯-২০) বরাদ্দ ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনাকালে জানা যায় যে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৭টি ওপি’র জুলাই ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত গড় ব্যয় ছিলো ১৭.২৭% এবং একই সময়ে জাতীয় ব্যয়ের গড় ছিলো ২৬.৩৭%।

ইতিমধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ এর সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফল স্বরূপ প্রজনণ স্বাস্থ্য সেবার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। চলাচল সীমিতকরণ, সেবা সীমিতকরণের কারণে নারীরা তাদের প্রয়োজনীয় প্রজনণ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। ফলে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ, নিরাপদ এমআর সেবা, মাতৃমৃত্যু হার, শিশুমৃত্যু হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি লকডাউনের কারণে বেড়েছে কিশোরী ও অল্প বয়সে বিয়ের সংখ্যা, যাদের অধিকাংশেরই নিরাপদ প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং এই মহামারীর প্রেক্ষিতে পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনতে হবে তাই কেবলমাত্র বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। বরং বরাদ্দকৃত বাজেট পরিকল্পনা মাফিক ব্যয় করা এবং মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরো কার্যকরী করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরাদ্দকৃত বাজেটে কার্যকরীভাবে ব্যয় করার জন্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের যে কাঠামো আছে তা সুচারুরূপে বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি, সরকারি কর্মসূচিতে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ, প্রচার ও পরিষেবা সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি সেবা নীতিমালা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

একইসাথে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে আরো কার্যকরী এবং গতিশীল করার জন্য উক্ত খাতে বরাদ্দকৃত বাজেট সুষ্ঠু ও যথোপযুক্ত ব্যয়ের লক্ষ্যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কার্যকরী সমন্বয় একান্ত আবশ্যক।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial