পরিবার পরিকল্পনা সেবায় অপূরনীয় চাহিদা শতকরা ১২ ভাগ
২০১৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত স্যাম্পল ভাইটাল স্টাটিকস রিপোর্ট (ঝঠঝজ) ২০১৮ এর রিপোর্টে দেখা যায় বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬.৪৬ কোটি এবং আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৩ এবং আমাদের টিএফআর ২.০৫। পরিবার পরিকল্পনা সেবার ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি যথেষ্ট থাকলেও এখনো শতকরা ১২ ভাগ মানুষের চাহিদা আমরা পূরণে সক্ষম হয় নি। এবারের আইসিপিডি সম্মেলনে তাই এই বিষয়টিকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার জন্য তাদের এজেন্ডোতে রেখেছে।
আমাদের দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্র রয়েছে এবং গ্রাম পর্যায়ে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক এবং পরিবার পরিকল্পনার এক রিপোর্টে দেখা গেছে প্রতি মাসে সারাদেশে প্রায় ৩০,০০০ সটেলাইট ক্লিনিক পরিচালনা করা হচ্ছে। আমাদের বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হলেও ১২ শতাংশ মানুষের পরিবার পরিকল্পনা সেবা চাহিদা পূরন করতে পারছি না। আর এটা করতে না পারলে আমাদের পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অচিরে একটা ধাক্কা খাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।
অপূর্ণ চাহিদার একটা বড় কারন হলো পার্বত্য এলাকার ৩৫% মানুষের কাছে সেবা পৌছানো সম্ভব হচ্ছে না পাশাপাশি হাওড়, চর অঞ্চলসহ প্রত্যন্ত এলাকার সেবা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। পাশাপশি বিভিন্ন ক্ষেত্র নারীদের কর্মক্ষেত্রের সময় সাথে সেবা কেন্দ্রের সময় একই হওয়া।
বর্তমানে ১৪ থেকে ১৯ বছরের বয়সী প্রজনণ সক্ষম মানুষ সর্বাধিক এবং আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী আমাদের মূল চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু এই কিশোর-কিশোরী ও তরুন জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের জন্য মাঠ পর্যায়ে তেমন কোন সেবা প্রতিষ্ঠান দৃশ্যমান নয়। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে কিশোর-কিশোরী ও তরুনদের জন্য একটা সেবা কর্ণার থাকার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার কারণে এ সেবা থেকে আমাদের কিশোর কিশোরী ও তরুনরা তাদের প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ হলো কিশোর কিশোরী ও তরুনরা যাদের বয়স সীমা ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে আর এদের জন্য সারাদেশে ৩০৬টি কৈশোর বন্ধব সেবাকেন্দ্র রয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
খুলনা, সাতক্ষিরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর এবং বরিশালের মাঠ পর্যায়ের সরেজমিনে দেখা গেছে অধিকাংশ সেবা কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলসেবা, পরিচালনা কমিটির নিষ্ক্রিয়তা, সেবা প্রদানকারীর অপ্রতুলতা সেবার মান উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। আরো দেখা যায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবাগুলোর অধিকাংশগুলোতে নেই নারী পুরুষের জন্য টয়েলেট ব্যবস্থা, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। কৈশোর বন্ধব সেবা কর্ণার নেই বললেই চলে।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থার গুনগত উন্নয়ন করা সম্ভব যদি স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর যৌথভাবে কাজ করে তা হলে প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব পাশাপাশি এই সব সেবা কেন্দ্র সেবা গ্রহিতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল এবং খুলনা জেলায় মেরিস্টোপ বাংলাদেশের সহায়তায় এবং বেসরকারী সংস্থা সুশিলনের টেকনিক্যাল সহায়তায় এবং স্থানীয় সরকারের বাজেট থেকে ২১৪টি ইউনিয়নের সেবা কেন্দ্রের মান উন্নয়ন কল্পে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বরিশাল জেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সেবা প্রদান উপকরণ, এ্যাম্বুলেন্স এবং অপরেসন এর যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে। পাশপাশি চলতি অর্থবছরের জন্য বরিশাল জেলায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ ১৬ হাজার ৫৫৩ টাকা এবং পিরোজপুর জেলার জন্য ৬৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
যদিও বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায় এই অর্থ ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে বরাদ্দ ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা যা কিনা গত অর্থ বছরের তুলনায় বেশী। এত বরাদ্দ বৃদ্ধির পরেও আমাদের সেবার মানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। প্রতিবছরই এই বরাদ্দের একটা বড় অংশ খরচ হয় না। কখনো কখনো দেখা যায় বছরের শেষে এসে তড়িঘড়ি করে কিছু কাজ সম্পাদন করা হয় যার গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমাদের দেশের অপূরনীয় চাহিদার একটা বড় কারণ হলো বিভিন্ন কারখানাতে নারী কর্মীদের কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত হওয়া। নারীদের জন্য কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত হলেও তাদের পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ছে যার কারণে অপূরনীয় চাহিদা বাড়ছে। এই অপূরনীয় চাহিদার পূরণে গামেন্টস সেক্টরে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও খুলনা অঞ্চলের মাছ কোম্পানিগুলোতে কর্মরত নারীদের জন্য তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাদের সময়ের সাথে সেবা কেন্দ্রের সময়ের সমন্বয় না হবার কারণে তারা পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। মেরিস্টোপ বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এবং সুশিলনের উদ্যোগে বাগেরহাট পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর এই সব মাছ কোম্পানীর ৫ হাজার কর্মীদের পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানের জন্য সপ্তাহে দুইদিন করে সেবা প্রদান করছে।
পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বাস্তবায়য়ে সরকার যে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে তার মধ্যে অন্যতম হলো পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদা এখনো ১২%, বিভিন্ন পদ্ধতি ছেড়ে দেওয়ার হার ৩০% এর বেশী এবং পুরুষদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার মাত্র ৭.৬%। আমাদের দেশে এখনো বাল্য বিবাহের হার বেশি প্রায় ৫৯% এবং আর একটা চ্যালেঞ্জ হলো প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা গ্রহনের হার ও বেশ কম। মান সম্পন্ন সেবা প্রদানের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো প্রতি ১২০০ থেকে ১৫০০ জন সেবা গ্রহিতার জন্য জন্য রয়েছে মাত্র একজন সেবা কর্মী।
পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান উন্নয়নের মধ্যদিয়ে এসডিজি অর্জন করা সরকারের জন্য সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাতে সরকারের সাথে মেরিস্টোপ বাংলাদেশের মতো দক্ষ এনজিও এবং সিভিল সোসাইটিকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যকর অংশগ্রহনের মাধ্যমে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ পরিচালনা কমিটিগুলোকে কার্যকর করার মধ্য দিয়েই প্রত্যাশিত সেবার মান উন্নয়ন করা সম্ভব যা কিনা আমাদের এসডিজি লক্ষ অর্জনে সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।
