আ’লীগের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ॥ ফলন্ত কলাগাছ লাগিয়ে
পিরোজপুরে স্কুলের নামে রেজিষ্ট্রি করে দেয়া জমি দখলের চেষ্টা
পিরোজপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে দানপত্রের দলিল রেজিষ্ট্রি করে দেয়া জমি ফের দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি চক্র। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নামে দলিল করে দেয়া এবং আদালতের মামলায় নিষেধাজ্ঞা থাকা বিরোধপূর্ন জমিতে রাতের আধাঁরে টলঘরের মতো ছোট ছোট ঘর তুলে এবং সেখানে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড টানিয়ে, আবার হঠাৎ করে জমির খোলা মাঠে ফলন্ত কলাগাছ লাগিয়ে একের পর এক অভিনব পন্থায় স্কুলের নামে দেয়া জমি দখলের পায়তারা করছে। এর এ ঘটনাটি ঘটছে পিরোজপুর সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের চুঙ্গাপাশা গ্রামে।
জানা গেছে, পিরোজপুর সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের চুঙ্গাপাশা গ্রামে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে দেয়া রেজিষ্ট্রিকৃত জমিতে সরকার দলীয় সাইনবোর্ড লাগিয়ে এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করে দখলের চেষ্টা ছাড়াও রেজিষ্ট্রিকৃত উক্ত বিদ্যালয়ের জমির কিছু অংশ বিক্রি করেও দেয়া হয়েছে। 
সরেজমিন চুঙ্গাপাশা গ্রামে গিয়ে বিদ্যালয়ের জমিদাতা ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে উক্ত গ্রামে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্থাপনের জন্য চার ব্যক্তি যথাক্রমে মো. হায়দার আলী হাওলাদার, লোকমান হোসেন হাওলাদার, মো. আলমগীর মৃধা ও মতিয়ার রহমান হাওলাদার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের নামে ৩৬ শতাংশ জমি দানপত্রের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রিপূর্বক দলিল করে দেন। (দলিল নং ৭৩/৯৫ ০৭.০১.৯৫)। তবে উক্ত জমিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অধ্যবদি কোন বিদ্যালয় স্থাপন করে নি। আর এই সুযোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়টির নামে রেজিষ্ট্রিকৃত জমির অংশ থেকে হায়দার আলী হাওলাদারসহ দু’জন দাতা ৯ শতাংশ করে মোট ১৮ শতাংশ জমি বেআইনিভাবে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। এদিকে, অন্য দু’জন দাতাও দানকৃত জমি তাদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জমিটির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না নিলেও জমির দাতারা বিদ্যালয়ের নামে দানকৃত জমি নিজেদের মালিকানা দাবী করে তা দখল করার জন্য গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের দিন জমির চারপাশে তারকাটার বেড়া দেয়াসহ বর্তমানে সরকারী সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত জমিতে রাতের আঁধারে ছোট তিনটি ঘর তুলে এবং সেখানে আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। ঘরের মধ্যে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিও ঝুলিয়ে রেখেছে। এছাড়া গত কয়েকদিন আগে জমির খোলা মাঠে ফলন্ত কলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছে।
এদিকে, বিদ্যালয়ের নামের জমি নিয়ে জটিলতার আবর্তে বিষয়টি দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ায় বিদ্যালয়ের জমি বিক্রয় ও দখলদারদের সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
এদিকে, বিরোধপূর্ন বিদ্যালয়ের জায়গার পাশেই দক্ষিণ-পূর্ব চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উক্ত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বাসিন্দারের একটি অংশ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে রেজিষ্ট্রিকৃত জমিটি তাদের বরাদ্ধ দেয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছে।
এদিকে, বিদ্যালয় মাঠের চতুর্দিকে কাঁটাতারের বেড়া থাকায় সেখানে পাশের দক্ষিণ-পূর্ব চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছে। বিদ্যালয়ের সামনের খোলা মাঠটি তারকাটা দিয়ে আটকে দিয়ে সেখানে ঘর তুলে আওয়ামী লীগের অফিস বানানো এবং মাঠে কলাগাছ লাগিয়ে দেয়ায় ডিপিসি একাডেমি’র কোমলমতি শিশুরা জাতীয় সংগীত, পিটি ও খেলাধুলা করতে পারছে না। স্কুলে যাতায়াতের পথটিও সরু হয়ে যাওয়ায় তাদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, বিগত দিনে ঘূর্ণিঝড় সিডরে চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে অনুদানপ্রাপ্ত হয়ে বিদ্যালয়টি সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালু রাখা হয়। এছাড়া বিদ্যালয়ের সামনের বিরোধীয় জায়গাটিতেও বালু ভরাট করে বাচ্চাদের খেলাধুলার উপযোগী করা হয়। বিদ্যালয় সংলগ্ন বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় লোকমান হাওলাদার ও হায়দার আলী হাওলাদার এই দু’জন বিদ্যালয়ের জমিদাতা এবং প্রভাবশালী হওয়ায় অসৎ উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ের নামে রেজিষ্ট্রিকৃত জমির ১৮ শতাংশ দখল করে বেআইনিভাবে বিক্রয় করে দিয়েছেন। অন্য দু’জন জমিদাতা এখন বাকী অংশটুকু দখলে নিতে নানাভাবে কৌশল করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ফুলু হাওলাদার জানান, চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি’র সামনের বিরোধীয় জায়গাটি খোলা অবস্থায়ই ছিল। চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি’র শিক্ষার্থীরা এখানে খেলাধুলাসহ স্কুলের কার্যক্রম করতো। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের দিনই রাতের বেলা হঠাৎ করে খোলা জায়গায় কাটাতারের বেড়া দিয়ে একটি কাঠ-টিনের ঘর তুলে সরকার দলীয় সাইনবোর্ড লাগানো হয়। এরপরে আরও দুটি ঘর তোলা হয়। এখন আবার সেখানে কলাগাছ লাগানো হয়েছে।
চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি’র ১ম শ্রেণির ছাত্রী নাইম জানায়, স্কুলের সামনে বেড়া দিয়ে এবং গাছ লাগিয়ে দেয়ায় তার এখন আর জাতীয় সংগীত ও পিটি করতে পারছে না। মাঠে খেলাধুলাও করতে পারছে না।
চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি’র ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সাহাদাত হোসেন বলেন, মহাপরিচালকের নামে দেয়া রেজিষ্ট্রিকৃত জমি জমিদাতারা মামলা করে এখন জমিটি ফেরত চাচ্ছেন। ফলে তাদের বাঁধার কারণে সেখানে আমরা এখন বিদ্যালয়ের কোনো কাজ করতে পারছি না।
এদিকে, জমিদাতা লোকমান হোসেন হাওলাদার বলেন, আমরা যখন জমি রেজিষ্ট্রি করে দিই তখন তাতে উল্লেখ ছিল, বেসরকারী বিদ্যালয় প্রতিষ্টিত না হলে বা বিদ্যালয় না চললে তখন ওই জমির মালিক আমরাই হব।
এদিকে, বেসরকারী বিদ্যালয়ের নামে দানপত্র করে দেয়া জমিটি ফেরৎ পেতে জজ পিরোজপুর আদালতে মামলা করেছে জমির দাতারা। অন্যদিকে দানকৃত জমিটি চুঙ্গাপাশা ডিপিসি একাডেমি’র নামে বরাদ্ধ দেয়ার দাবী জানিয়ে উক্ত মামলায় পক্ষ হয়েছে ডিপিসি একাডেমি’র কর্র্তৃপক্ষ। আদালত জামির উপর স্থিতিবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে। তবে আদালতের স্থিতিবস্থার আদেশ অমান্য করে জমিদাতা লোকমান হোসেন গংরা জমিটি নিজেদের দখলভুক্ত প্রমান করার জন্য সেখানে হঠাৎ করে তারকাটার বেড়া দিয়ে, গাছ লাগিয়ে এবং ঘর তুলে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড লাগিয়ে সরকার দলীয় দৃষ্টিভংগিকে কাজে লাগানোর নানা পন্থা অবলম্বন করছেন।
