উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় শিরিনা আফরোজ
‘যেকালে কোন সমস্যায় পড়ি হেই সময়ই মাইয়াডার কাছে দৌড়াইয়া যাই। আর হেও মোরে খালি আতে ফিরায় না। এইবার যদি উপজেলা নির্বাচনে হ্যারে এউক্কু ভোট দিতে পারি হেইলে মোনডায় কটু শান্তি পাইতাম।’ এভাবে কথাগুলো বলেছিলেন পিরোজপুর সদর উপজেলার মাছিমপুর গ্রামের অসহায় নারী নাসিমা বেগম। আর যার সম্পর্কে বলেছিলেন তিনি পিরোজপুরের প্রিয় মুখ সাংবাদিক শিরিনা আফরোজ।
শিরিনা আফরোজ পিরোজপুরে একজন সাহসী সাংবাদিক হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত মুখ। আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পিরোজপুর সদর উপজেলার চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে আলোচনায় চলে এসেছে তার নাম। পিরোজপুরে নারীর আরো ক্ষমতায়ন বা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে আগামীতে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান এলাকার নারীনেত্রীসহ সর্বস্তরের জনগণ।
২০০৬ সাল থেকে সাপ্তাহিক পিরোজপুর বানী নামের স্থানীয় গণমাধ্যমে কাজ করার মধ্যে দিয়ে সাংবাদিকতায় পেশায় পথচলা শুরু করেন শিরিনা আফরোজ। এরপর ২০০৮ সালে একুশে টেলিভিশনের পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে আসছেন। এর আগে ২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় সুনামের সাথে কাজ করেছেন। ২০০৯ সাল থেকে জাতীয় দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় স্বদর্পে কাজ করে যাচ্ছেন। করেছেন সাংবাদিকতায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে ডিপ্লোমা। সাংবাদিকতা পেশায় পথচলায় সৎ আর সাহসী লেখনীর কারণে তাঁর উপর নেমে এসেছে ক্ষমতাসীন ব্যাক্তিদের খড়গ। ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একের পর দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচন করে গেছেন লেখনীর মাধ্যেমে। শুধু তাই নয় তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে জীবনের জয়গান, মনবিকতা যেখানে তলানিতে পৌঁছেছে সেখান থেকে নতুন করে ঘুরে দাড়ানোর অসংখ্য গল্প। শিরিনা আফরোজ এর ভাষায় শখের বসে সাংবাদিকতা শুরু করি যা নেশায় এবং পেশায় পরিনত হয়েছে। আগামীতে কাজ করে যেতে চাই বহুদূর। প্রতিটি অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়ে হাসি ফোটাতে চাই তাদের মুখে। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০০৯ সালে আর্টিকেল-১৯ এর পক্ষ থেকে উইমেন জার্নালিষ্ট ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। পিআইবির বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে যোগ্যতার প্রমান দিয়েছেন।
সংসার জীবন শুরু করেছিলেন এইচএসসি পাশের পর। কিন্তু থেমে থাকেননি এই অদম্য নারী। সংসার ধর্ম পালনের পাশাপাশি সম্পন্ন করেছেন স্নাতক, স্নাতোকত্তর, এল এল বি। গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে স্নাতোকত্তর অধ্যায়নরত আছেন। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষা জীবনেও তার ফলাফল ছিলো সাফল্যজনক। তিনি বলেন, আমার শৈশব কেটেছে পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী গ্রামে। জিন্নাত আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে এস এসসিতে প্রথম বিভাগে উত্তির্ন হয়ে পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তী হই। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম সরদার নিজে সংগে এসে ততকালিন অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান স্যারের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, আমি আপনাকে একটি সম্পদ দিয়ে গেলাম। এর পর আমি কৃতিত্বের সাথে কলেজ জীবনে অনেক পুরষ্কার অর্জন করেছি। কোন কিছু পাওয়ার আশায় দিন রাত মানুষে র জন্য কাজ করিনি। আমার ভিতরে ন্যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার আর মানুষের জন্য মানবিক কাজ করার একটি পোকা আছে। তাই আমি ঝুঁকি নেই। এ পর্যন্ত কত মানুষের সহায় হয়েছি তার হিসেব আমি রাখিনি। তবে কেউ আমাকে ভুলে যায় না। যারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে তারা ঠিকই এসে আমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অসহায় মানুষের সহায়তা করে। শিরিনা আফরোজ আরও বলেন, এলাকার জন মানুষের দাবি আমি যেনো আসন্ন উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নেই। কিন্তু চাইলেই তো হবে না। দল যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি সক্রিয়ভাবেই মাঠে থাকবো।
নেতৃত্ব দেওয়ার গুনাবলি সেই কলেজ জীবনের প্রথম দিন থেকেই। পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী নিবাসের নেতৃত্ব দেয় ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তুখোড় এই তার্কিক কলেজ পর্যায় জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছেন। এছাড়া শৈশব থেকেই উপস্থাপনা, একক অভিনয়, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগীতায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বহু পুরষ্কার অর্জন করেছেন।
তার কলেজ জীবনের শিক্ষিকা গীতা রাণী বলেন, শিরিন আমার অতি স্নেহের ছাত্রী। মানুষের মুখে যখন ওর প্রশংসা শুনি গর্বে বুকটা ভরে যায়।
২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব আর ২০০৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মহিলা পরিষদের পিরোজপুর জেলা শাখার আন্দোলন সম্পাদকের দায়িত্ব, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। শুধু তাই নয় পিরোজপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সহকর্মীদের।
জেলা মানবাধিকার কমিশনের দায়িত্ব শহর সমাজ সেবার সাংগঠনিক সম্পাদক ও অসহায় নারীদের জন্য কর্মসংস্থান ও সাবলম্বি করার উদ্যোগ গ্রহণ করা সহ সমাজ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজের জন্য অর্জন করেছে বেগম সুফিয়া কামাল লিডারশিপ ফেলোশীপ।
কাউখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী নেত্রী রুহিয়া বেগম হাসি বলেন, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলে সেই অর্থে কোন নারী নেত্রী তৈরী হয়নি। সাংবাদিক হিসেবে শিরিনা আফরোজ সেই জায়গার অনেকটাই পূরণ করেছে বলে আমার মনে হয়।
উল্লেখ্য, আগামী মার্চে প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। এবারও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ধাপে ধাপে করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয় বা সাত ধাপে ৪৯০ উপজেলায় ভোটগ্রহণ হতে পারে।
