প্রধান সূচি

নাজিরপুরে গৃহহীনদের ঘর স্বচ্ছল পরিবারে !

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় দরিদ্র ও গৃহহীন পরিবারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন সচ্ছল পরিবারের লোকজনসহ সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের স্বজনরা। পরে বরাদ্দ পাওয়া ওই ঘর গৃহহীনদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাছাড়া ঘর নির্মাণে নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহার এবং প্রকল্পের নীতিমালা ও শিডিউল মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানসহ সদস্যরা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নিয়ে সচ্ছল পরিবারের লোকজনসহ নিজেদের স্বজনদের ঘরগুলো বরাদ্দ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ঘর বরাদ্দে প্রকল্পের নীতিমালা মানা হচ্ছে না। যাচাই-বাছাই ছাড়াই টাকার বিনিময়ে এসব ঘর বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে সচ্ছলদের।

স্থানীয় দরিদ্র ও ভূমিহীনদের অভিযোগ, ইউএনও’র আনুকূল্যে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা ঘর বরাদ্দে অনিয়মের সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া, যেসব ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে তাতে নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে।

উপজেলা কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে বরাদ্দের অর্থ তুলে গৃহ নির্মাণ সামগ্রী তৈরি করে অধিকাংশ ঘরের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে তালিকাভুক্তদের বাড়ীতে ঘর তুলে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ তাদের জন্য ওই প্রকল্পের অধীনে নাজিরপুর উপজেলায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে একটি প্রকল্পের অনুকুলে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। এ বরাদ্দ থেকে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ১০০টি ঘর নির্মাণ করা হবে।

উপজেলার সেখমাটিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলামের অভিযোগ, তার ওয়ার্ড থেকে তিনি যে তালিকা দিয়েছে তার মধ্যে কেউই ঘর পায়নি। তার দেয়া তালিকার সকলেই দারিদ্র ও গৃহহীন ছিলো। টাকার বিনিময়ে ভূমিহীন পরিবারের পরিবর্তে জমি, ঘর-বাড়ি আছে এমন মানুষদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার ওয়ার্ডে ঘর পেয়েছে চেয়ারম্যানের মটর সাইকেল চালক জিয়াদ মোল্লা। তার বাড়ীতে বিল্ডিং করার জন্য মালামাল জড়ো করে প্রস্তুুতিও নেয়া হয়েছে। ওই ঘর তিনি তার প্রতিবেশী মাজাহার খানের কাছে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। কর্তৃপক্ষ জিয়াদের নামে বরাদ্দ দেয়া ঘরটি মাজাহারের বাড়ীতে তুলেও দিয়েছে।

বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাজাহারের বাড়ীতে ওই ঘরটি উত্তোলনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঘরের সামনে কর্তৃপক্ষের লাঘিয়ে দেয়া সাইনবোর্ডে উপকারভোগী হিসেবে জিয়াদ মোল্লার নামসহ গৃহ নং- ৯৯, বাস্তবায়নকারী-ঝুমুর বালা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, নাজিরপুর লেখা রয়েছে। তখন মাজাহারকে ওই ঘরে মালামাল তুলতে দেখা যায়। তার ঘরে উপকারভোগী হিসেবে অন্য লোকের নাম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একজন গৃহহীন মানুষ। মাত্র ৪ শতক জায়গার ওপর বাড়ী। অন্য কোন জমিও নাই। দিন মজুরের কাজ করে ৬ জনের সংসার চালাই। চার ছেলেসহ স্ত্রী নিয়ে কোন রকম ছাপরা ঘরে বসবাস করতাম। উপজেলা ঘর এসেছে শুনে চেয়ারম্যানের কাছেও গিয়েছি কিন্তু আমার নামে ঘর বরাদ্দ হয় নি। পরে বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী জিয়াদ মোল্লার কাছে তার বরাদ্দ পাওয়া ঘরটি ৩০ হাজার টাকায় কিনেছি। এখনো সব টাকা দিতে পারিনি। সুদে এনে জিয়াদকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে জিয়াদ মোল্লার সাথে কথা হলে তিনি ঘর বিক্রির কথা অস্বীকার করে বলেন, মাজাহার আমার আত্মীয় এবং তিনি গৃহহীন তাই আমার নামে বরাদ্দ হওয়া ঘরটি তাকে দেয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ইউনিয়নের বাসিন্ধা আরেক গৃহহীন বলেন, ‘নিজের জায়গা জমি নেই। ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে হয়। টানাপড়েনের সংসার। নানা চেষ্টা করেও ১৫-২০ হাজার টাকা জোগার করতে পারিনি। তাই ঘর মেলেনি।’

শুধু সেখমাটিয়া নয়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে অন্য ৮টি ইউনিয়নেও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের ১৫-২০ হাজার টাকা দিতে না পারায় এসব ইউনিয়নের দরিদ্র ও গৃহহীন পরিবারগুলো আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ পায়নি।

ঘর বরাদ্দে অনিয়মের কারণে ক্ষুব্ধ উপজেলার অনেক ইউপি সদস্যরাও। তাদের অভিযোগ, ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রকৃত গৃহহীনদের নামে ঘর বরাদ্দের কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সদস্য সচিব পিআইও মো. ই¯্রাফিল জানান, জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তালিকা যাচাই-বাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় কোন অনিয়ম হয়নি। ওই তালিকা অনুযায়ী ঘর বরাদ্দ হচ্ছে। ঘর পেয়ে কেই বিক্রি করলে বা অন্য কাউকে দিলে আমাদের কি করার আছে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial