নাজিরপুরে যৌতুকের বলি গৃহবধূ রোজিনা
পিরোজপুরের নাজিরপুরে যৌতুকের কারণে রোজিনা (৩৫) নামের এক গৃহবধূ মারা গেছে। স্বামীর শারীরিক ও মানষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন করে অসুস্থ হয়ে পড়লে রোজিনাকে গত শনিবার সকালে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায়
রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মারা যান। মৃত রোজিনা উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের আলী আকবরের মেয়ে। রোজিনার মিতা নামে ১৩ বছরের একটি মেয়ে ও আলিফ নামে ৭ বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
নিহত রোজিনার পিতা আলী আকবর জানান, বিগত ১৫ বছর পূর্বে উপজেলার সেখমাটিয়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের আলতাফ সরদারের ছেলে শাহাজাদা মিলনের সাথে পারিবারিকভাবে রোজিনার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই মিলন যৌতুকের জন্য রোজিনাকে শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন করতো। এক পর্যায়ে রোজিনার পিতা জামাতা মিলনকে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সামনে মিতা ফার্মেসী নামে একটি ওষুধের দোকান করে দেয়। মিলন তখন থেকে স্ব-পরিবারে হাসপাতালের পিছনে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিল। কিছুদিন সুখে-শান্তিতে ঘর সংসার করলেও এক পর্যায়ে রোজিনাকে না জানিয়ে গোপনে মিলন এক এক করে আরো ৫টি বিয়ে করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ লেগেই থাকতো। সর্বশেষ ময়না নামে ঢাকায় বসবাসরত এক মেয়েকে বিয়ে করে। এ ঘটনা জানা-জানি হলে পুনরায় তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে এ বিষয়ে স্থানীয় গন্যমান্যদের নিয়ে বৈঠকে বসলে সেখানে মিলন তার ঢাকায় বসবাসরত স্ত্রী ময়নাকে তালাক দিয়ে রোজিনাকে নিয়ে সংসার করার অঙ্গিকার করে এবং ময়নাকে তালাক দেয়ার জন্য ৪ লাখ টাকা রোজিনার পিতার নিকট যৌতুক দাবী করে। তখন রোজিনার পিতা মেয়ের সুখের জন্য জমি বিক্রি করে মিলনকে ৪ লাখ টাকা দেয়। ওই টাকা নিয়েও মিলন ময়নাকে তালাক না দিয়ে তার সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। এ নিয়ে কথা কাটা-কাটি হলে মিলন সম্প্রতি রোজিনাকে মারধর করে এবং পিতার নিকট আরো টাকা এনে দিতে বলে। এ ঘটনায় রোজিনা মিলনকে আসামী করে পিরোজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি বর্তমানে নাজিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে। ওই মামলা করায় মিলন ক্ষিপ্ত হয়ে রোজিনাকে তালাক দেয়। এ তালাকের নোটিশ পাওয়ার পর এক সপ্তাহ ধরে রোজিনা তার নিজের এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। এক পর্যায়ে নিরুপায় হয়ে রোজিনা গত শনিবার সকালে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন করে অসুস্থ হয়ে পড়লে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। রবিবার সকালে সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
মৃত রোজিনার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়–য়া মেয়ে মিতা জানায়, প্রায় সময়ই তার পিতা-মাতার মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকতো। তখন তার পিতা মা রোজিনাকে মারধর করতো। কয়েকদিন ধরে মা রোজিনা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। শনিবার সকালে সে অনেকগুলো ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে মিতা তার নানা আলী আকবরকে জানায়। তিনি এসে রোজিনাকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।
মৃত রোজিনার ভগ্নিপতি লিটন জানান, যৌতুকের দাবীতে মিলন রোজিনাকে বিভিন্ন সময় মারধর করেছে। তাকে একাধিকবার হাসপাতালেও ভর্তি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত শাহাজাদা মিলন পলাতক থাকায় এবং তার মুঠোফোনটি বন্ধ থাকায় তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার ফার্মেসীর কর্মচারী রফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি মিলনের পারিবারিক তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারবো না। যতোটুকু জানি, বিগত তিন মাস আগে মিলন তার স্ত্রী রোজিনাকে তালাক দিয়েছে।
নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাক্তার শোভন রায় চৌধুরী বলেন, ‘রোজিনার পরিবারের পক্ষ থেকে তার সমস্যা সম্পর্কে কিছুই জানাতে পারেনি। তবে শারীরিকভাবে সে খুব দুর্বল ছিল। চিকিৎসার এক পর্যায়ে আমাদের কাছে মনে হয়েছে সে পয়জনিংজাতিয় কিছু সেবন করেছে। তার শারীরিক অবস্থা খারাপ দেখে আমরা তাকে খুলনা মেডিকেলে রেফার্ড করি। কিন্তু সকালেই সে মারা যায়। বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।’
নাজিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কেএম সুলতান মাহমুদ জানান, এ ঘটনায় আমরা কোন অভিযোগ পাইনি এবং হাসপাতাল থেকেও জানানো হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
