পিরোজপুরে প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন শহীদ ওমর ফারুক
আজ ২৩ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পিরোজপুরের আকাশে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন মহাকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি সোহরাওয়ার্দী কলেজের বি.কম শ্রেনীর ছাত্র ওমর ফারুক। আর এ অপরাধেই লোহার রডে জয়বাংলার পতাকা বেঁেধ তার মাথায় ঢুকিয়ে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে বর্বর পাক বাহিনী।
একাত্তরের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের সোনালী মানচিত্র অংকিত একটি পতাকা নিয়ে পিরোজপুরে আসেন ওমর ফারুক। পিরোজপুর শহরের টাউন ক্লাব ময়দানের শহীদ মিনারের পাদদেশে ছাত্র জনতার অংশ গ্রহণে এক সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ওমর ফারুক পিরোজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। সেদিন ২৩ মার্চ সকাল ১১ টার মধ্যে কানায় কানায় পূর্ন হয়ে যায় মাঠটি আর সকলের সামনেই পিরোজপুরের আকাশে প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন শহীদ ওমর ফারুক।
২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা করলে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় ওমর ফারুক এলাকার ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। ৪ মে পিরোজপুর শহর দখল করে নেয় পাক সেনারা। ফারুক তখন জেলার স্বরূপকাঠীর আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগানে থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এক পর্যায় ২৯ মে ৭১’ ওমর ফারুক স্বরূপকাঠীর বিলাঞ্চল হয়ে ভারত যাবার প্রস্তুতিকালে পিরোজপুরের পুলিশ সদস্য হানিফ তাকে চিনে ফেলে ও আলবদরদের সহায়তায় আটক করে বরিশালে পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে তুলে দেয়। ৪ জুন বরিশালের কীর্তন খোলা নদীর তীরে ১৪ গোডাউন ঘাটের বধ্যভূমিতে নিয়ে ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের রক্ত পিপাসু নরপিচাশ কর্নেল আতিকের নির্দেশে সহযোদ্ধাদের নাম ও অবস্থান জানার জন্য অমানবিক নির্যাতন করা হয় ফারুককে।
ফারুকের সাথে আটক থাকা এক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হক স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জানান, ফারুকের সাথে থাকা ব্যাগের ভিতর তল্লাশি চালিয়ে ৭টি বাংলাদেশি পতাকা পেয়েছিল রাজাকাররা। তিনি জানান, নির্যাতনের সময় তাকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলা হয়। যতবার তাকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলা হয় ততবার সে তার শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে জয় বাংলা বলে চিৎকার দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কর্ণেল আতিকের নির্দেশে লোহার একটি রডের এক মাথায় সেই বাংলাদেশি একটি পতাকা বেঁধে অন্য অংশটি একটি হাতুরী দিয়ে টাকিয়ে টাকিয়ে ওমর ফারুকের মাথায় ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এক সময় শরীরের সব রক্ত ঝরে গেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
আব্দুল হক আরো জানিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষা দিতে মৃত ওমর ফারুকের লাশ তিন দিন গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাক সেনারা। পরে তার মৃত দেহটি কীর্তন খোলার উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেয় পাক হায়নারা। আর পুত্র শোকে শোকাতুর পিতা সৈয়দুর রহমান শরীফ স্বাধীনতার কিছুদিন পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্ধপ্রায় মা কুলসুম বেগম এখনও রাস্তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এই বুঝি বড় ছেলে ফারুক বাড়ি ফিরলো। তবে তার প্রিয়জনেরা আজও এই মৃত দেহের সন্ধান পায়নি। স্বাধীনতার পরে পিরোজপুর শহরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে শহীদ ওমর ফারুক সড়ক নামে।
