পিরোজপুরে শুরু হয়েছে ভাড়ানি খাল খননের কাজ : চলছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ
পিরোজপুরে শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে ভাড়ানি খাল অবশেষে পুন:খনন ও খাল পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার সকাল থেকে পিরোজপুর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহায়তায় শুরু হয়েছে খাল খনন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম। খালের ম্যালেরিয়া পুল এলাকা থেকে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
পিরোজপুর পৌর শহরের দামোদার খালের উৎস্য মুখ পৌর ভূমি অফিসের পাশ থেকে শুরু হয়ে শহরের সাধনা পোল, শেখপাড়া, পাড়েরহাট সড়ক হয়ে বড়পুল নামক স্থান পর্যন্ত ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ২২ ফুট প্রস্থের এ খালটির দুই পাশ দখল করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এছাড়া খালের ওপর বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে পৌরসভা ও ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট ছোট ব্রীজ ও কালর্ভাট নির্মান করা হয়েছে। অন্যদিকে খালের পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিম পাড়ে খালের মধ্য থেকে নেওয়া হয়েছে অগণিত পানির পাইপ লাইন। ফলে ব্রীজের পিলার ও পানির পাইপের কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত এবং এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছিল। এছাড়া খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে এটি ময়লার ভাগারেও পরিনত হয়েছে।
তবে বর্তমানে খাল পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও সংস্কারের উদ্যোগের ফলে এসব অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে খালটি পরিকল্পিতভাবে খনন করলে এটি কিছুটা হলেও পূর্বের রূপ ফিরে পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পৌরবাসী।
পিরোজপুর ভূমি অফিসের একটি সূত্র জানায়, ভারানী খাল অবৈধ দখলমুক্ত করে খাল খননের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার, পৌরসভার সার্ভেয়ার এবং জেলা পরিষদের সার্ভেয়ারদের সমন্বয়ে একটি টিম খালের পরিমাপ করেছে এবং অবৈধ দখলের স্থানগুলো চিহিৃত করে লালনিশানা টানিয়ে দেওয়া হয়। পরিমাপে দুই কিলোমিটার অংশ জুড়ে খালের দুই পাড়ে ৩০টিরও অধিক স্থানে খাল দখল করে নানা স্থাপনা নির্মানের বিষয়টি চিহিৃত করা হয়েছে। সেভাবেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আল-আমীন জানান, ভারানী খাল পরিমাপের জন্য সার্ভেয়ারদের সমন্বয়ে একটি সার্ভে করা হয়েছিল। তার আলোকেই খালের সংস্কার কাজ ও উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়েছে। খালের দুই পাড়ে যারা অবৈধভাবে স্থাপনা করেছেন তা সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হয়েছিল। এখনও যদি কোন অবৈধ স্থাপনা থাকে তাহলে তা উচ্ছেদ করা হবে।
এদিকে, উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হিসেবে শুক্রবার খালের দুই পাশের বেশ কয়েকটি অবৈধ স্থাপনা ও গাছ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু পাঁকা স্থাপনাও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শেখ রশীদ আল মুনান জানান, মৃতপ্রায় ভারানী খাল সংস্কার ও দখলমুক্ত করণের কাজটি খুবই ভাল উদ্যোগ। তবে এটি যেন আবার মাঝপথে বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকটাতে প্রশাসনের নজর দিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও টিআইবি’র সচেতন নাগরিক সমাজ (সনাক) পিরোজপুর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ রব্বানী ফিরোজ বলেন, এক সময় এই ভারানী খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করতো। জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা থেকে গহনা নৌকা বলেশ্বর-কঁচা নদী হয়ে পাড়েরহাট মৎস্য বন্দর থেকে এই ভারানী কাল দিয়ে এখনকার ম্যালেরিয়া পুলের এখানে এসে ভিড়তো। সেই খালটি কালের আবর্তে নানা কারণে অস্তিত্ব হারাতে চলেছে। তবে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত চেষ্টা খালটি সংস্কারের যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাই।
পরিবেশবাদী তারেক রানা চৌধুরী বলেন, ঐতিহ্যবাহী পিরোজপুর-পাড়েরহাট ভারানী খালটিকে সংস্কার ও পুন:খনন করার ব্যাপারে পিরোজপুরে জেলা প্রশাসক যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা খুবই ভাল উদ্যোগ। কোন প্রকল্প ছাড়াই খুব স্বল্প পরিসরে কাজটি শুরু হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে পিরোজপুরের খালগুলোকে খনন করার জন্য একটি পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, এই খাল শুধুমাত্র পানি প্রবাহের জন্যই নয়, বরং পিরোজপুর শহরের পরিবেশ সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। তিনি খালের পাড় দখলমুক্ত রেখে সবুজায়নের দাবি জানান।
পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, পিরোজপুর পৌরবাসীর প্রাণের দাবি ছিল শহরের মধ্য থেকে প্রবাহিত হওয়া খালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ন এই খালটি দখলমুক্ত ও খনন করা। এই খালের যে দূষণ এবং দখল ছিল তাতে পানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। স্থানীয়রা আমাকে বলেছে, একসময় এখানে এই খালের বেশ প্রভাব ছিল। এখানে বড় বড় নৌকা চলতো, লোকজন গোছল করতো। বর্তমানে পলিথিন ও ময়লা আবর্জনার কারণে খালটি ভরাট হতে চলছে। তাই আমরা খালটি খননের কার্যক্রম শুরু করেছি। রাজনৈতিক মহল, ছাত্র নেতৃবৃন্দ, স্বেচ্ছাসেবী, এলাকাবাসীর সহযোগিতা নিয়ে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ খালটির খনন কাজ ও খালের দুই পাড় দখলমুক্ত করা হচ্ছে। আশাকরি খালের দুই পাশের এলাকাবাসীরাও এ কাজে আমাদের সহায়তা করবে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সরকারী কোন বরাদ্ধ ছাড়াই খালের সংস্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সরকারী বড় কোন প্রকল্পের মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে খালটি খনন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
