প্রধান সূচি

মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন

বড় ভাই এমপি হলেও চ্যালেঞ্জে রিয়াজ : ফুরফুরে আমেজে বায়জিদ

উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে কাল রবিবার পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী ঘরানার প্রতিদ্বন্দ্বি দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে একাধিক হামলা, মামলা-পাল্টা মামলায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নির্বাচনে বর্তমান এমপি শামীম শাহ নেওয়াজের ছোট ভাই চেয়ারম্যান প্রার্থী রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ দলের বিভক্তি এবং পরিবারে এমপি, আবার ওই পরিবারে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং আত্মীয় স্বজন বিভিন্ন পদ পদবীতে থাকায় ভোটাররা ওই পরিবারে ভোট দিবেন কিনা তা নিয়ে শেষ সময়ে হিসেব নিকেশ চলছে। এতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এমপির ছোট ভাই আনারস প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ। সাধারণ ভোটারদের এমন আবেগ ও অনুভ‚তি কাজে লাগিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আছেন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী দোয়াত কলম প্রতীকের বায়জিদ আহম্মেদ খান।
পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে গত ৭ জানুয়ারী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শামীম শাহনেওয়াজ (কলারছড়ি প্রতীক) তারই কনিষ্ঠ ভাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমানের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি চারবারের সংসদ সদস্য ডা. রুস্তুম আলী ফরাজীকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আশরাফুর রহমান গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ও নৌকা প্রতীক পেলেও জাতীয়পার্টি (এরশাদ) প্রার্থীকে দলীয় সিদ্ধান্তে আসনটি ছেড়ে দেয়ায় বড় ভাইকে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাড় করিয়েছিলেন। এর আগেও ২০১৮ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আশরাফুর রহমান উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় আপন মেজ ভাই রিয়াজ উদ্দিনকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। আনারস প্রতীক নিয়ে রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ এবার আবার নির্বাচন করলেও মাঠে সক্রিয় থাকায় প্রতিদ্ব›িদ্ব চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনে নতুন মুখ ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের (দক্ষিণ) সাবেক সভাপতি দোয়াত-কলম প্রতীকের প্রার্থী এডভোকেট বায়জিদ আহম্মেদ খানের সাথে তুমুল প্রতিদ্ব›িদ্বতার সম্মূখীন হবেন বলে সাধারণ ভোটারদের ধারণা।
মঠবাড়িয়ায় ৬ষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মোট ৬জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের (দক্ষিণ) সাবেক সভাপতি এডভোকেট বায়জিদ আহম্মেদ খান, সাবেক পৌর কাউন্সিলর মো. আবু মোতালেব মধু, বায়জিদ আহম্মেদের বড় ভাই আইনজীবী মো. মনির হোসেন সোহেল, যুবলীগ নেতা মো. মাহবুবুর রহমান ও সমাজ সেবক মো. রফিকুল্লাহ। তবে রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ (আনারস প্রতীক) ও এডভোকেট বায়জিদ আহম্মেদ খানের (দোয়াত-কলম) মধ্যেই মুলত: দ্বিমুখী লড়াই হবে। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে এ দু’জন প্রার্থী উক্ত দুই প্রার্থীর ডামি প্রার্থী হয়ে মাঠে কাজ করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এক সদস্য বলেন, বড় ভাই এমপি, ছোট ভাই উপজেলা চেয়ারম্যান, তাহলে অন্য যোগ্যদের দল করে লাভ কি! গত এমপি নির্বাচনে শামীম শাহ নেওয়াজকে ভোট দিয়েছি এবার বায়জিদের পক্ষে থাকবো। ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের শুরুতে প্রতীক বরাদ্ধের দিন শোডাউন করায় আচরণ বিধি লংঘনের দায়ে নির্বাচন কমিশন রিয়াজ উদ্দিনের প্রার্থীতা বাতিল করে। এতে তার ৩/৪ দিন নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ থাকায় প্রার্থী (আনারস) ও তার কর্মী সমর্থকরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। এতে বেশ অস্বস্তিতে পরে রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ। পরে অবশ্য তিনি উচ্চ আদালতে আপীল করে প্রার্থীতা ফিরে পেলেও মাঠ পর্যায়ের কমী সমর্থদের মনোবল চাঙ্গা করতে পারেন নি। এরমধ্যে ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে ২৯ মে’র নির্বাচন ১০ দিন পিছিয়ে ৯ জুন নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে, স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দ্বিধা-বিভক্তি দীর্ঘদিনের। রিয়াজ উদ্দিনের কনিষ্ঠ ভাই আশরাফুর রহমান নিজেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দাবী করায় অপর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক সেলিম মাতুব্বরের পদ নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। এছাড়া ৭ জানুয়ারীর সংসদ নির্বাচনের সময় মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস ও তার অনুসারীরা রিয়াজ উদ্দিনের ভাই শামীম শাহনেওয়াজের পক্ষে থেকে নির্বাচনসহ সকল দলীয় কর্মকান্ডে থাকলেও উপজেলা নির্বাচনে তারা রিয়াজ উদ্দিনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বায়জিদের পক্ষে শক্ত অবস্থানে নেমে নির্বাচনী প্রচারণা চালায়।
দলের হাই কমান্ডের বিধি নিষেধ না থাকায় এমপি শামীম শাহ নেওয়াজ আপন ভাইয়ের জন্য প্রকাশ্যে ভোট চাইতে না পারলেও প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী বায়জিদের পক্ষে আওয়ামী লীগের একটা বিরাট অংশসহ এ আসন থেকে নির্বাচিত থেকে চারবারের এমপি ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী, ১১ইউনিয়নের ৬ জন ইউপি চেয়ারম্যান বায়েজিদের পক্ষে নির্বাচনী মাঠে কাজ করছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এমাদুল হক খান বলেন, রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের পরিবার একটি মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী পরিবার। প্রতীক বরাদ্ধ পেয়ে স্থানীয় জনতা আনন্দ প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে প্রার্থিতা বাতিল করে। পরে উচ্চ আদালতে আপীল করলে প্রার্থীতা ফিরে পায়। ৫/৬ দিন নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এতে তার জনপ্রিয়তা বাড়ে। ৫ বছর উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন অত্যন্ত সততার সাথে জনগণের সেবা করে আসছেন। আশাকরি এ নির্বাচনে রিয়াজ উদ্দিন বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হবে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস বলেন, এটি দলীয় কোন নির্বাচন নয়। আর উপজেলা চেয়ারম্যান হবার আগে রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ দলীয় মিটিং মিছিলসহ কোন কর্মকান্ডে ছিল না। চেয়ারম্যান হবার পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বায়জিদ আহম্মেদ খান ওয়ার্ড, উপজেলা, জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং উচ্চ শিক্ষিত নম্র ও ভদ্র বলে তার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছি। আশা করছি বায়জিদকে ভোটাররা তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।
এদিকে, নির্বাচনের শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সহিংসতায় প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছে।
সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ূম বলেন, অবাদ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের লক্ষ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নে মোট ১২জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও ৪ প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, ব্যাটলিয়ন আনসারসহ সাধারণ আনসার মোতায়েন করা হয়েছে।
উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১১ইউনিয়নের মোট ৮৮টি কেন্দ্রে ২ লক্ষ ২৬ হাজার ২২১ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial