মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
স্বরূপকাঠীর সাবনূরের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন কি স্বপ্নই রয়ে যাবে !
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ২নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ কামারকাঠি গ্রামের দিনমজুর বাবুল মোল্লার মেয়ে সাবনূর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সাবনূরের উত্তীর্ণের খবরে দিনমজুর এ্যাজমা রোগে আক্রান্ত পিতা বাবুল ও মা সাবিনা বেগমসহ খুশিতে আত্মহারা তার শিক্ষকরাও। সাবনূর সদ্য প্রকাশিত মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় জামালপুর শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
অভাব অনটনের সংসারে উপজেলা থেকে সাবনূরের একার এ অসামন্য কৃতিত্বে তার পিতা মাতার চোখ আনন্দে ছল ছল করছে। তবে, দুশ্চিন্তায় বাবুল মোল্লার পরিবার।
এলাকাবাসি বলছেন, বরিশালের বানারিপাড়ায় মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া রিক্সা চালকের মেয়ে হারিসার দায়িত্ব নিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ, কিন্তু সাবনূরের কি হবে? তার দায়িত্ব নিবে কে? সাবনূরের ভর্তি, পড়াশুনার খরচ চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার বলে এ দুশ্চিন্তার কারণ। বাবুল মোল্লার মেয়ের পড়ার খরচ চালাতে কোন বিত্তবান লোক যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন সাবনূরের স্বপ্নই থেকে যাবে।
সাবনূরের বাবা বলেন, আমার ১ ছেলে, ২ মেয়ে। আমি একজন দিনমজুর। তার উপরে বছর পাঁচ ধরে এ্যাজমা রোগে আক্রান্ত। আগের মত কাজও করতে পারিনা। আমার স্ত্রী (সাবনূরের মা) একজন গৃহীনি। আমার একার আয়ে পরিবারের ভরণ পোষনের কষ্ট হয়। তার তার উপর তিন ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে গিয়ে ধার দেনায় জর্জারিত। আগের মত কাজ করতে পারিনা বিধায় মাঝেমধ্যে সাবনূরের মা সংসারের একটু সচ্ছলতায় তিনিও কাজ-বাজ করে।
তিনি জানান, সাবনূর ছোট থেকে স্কুলে ভাল ছিল। তার শিক্ষকরা তাকে নিয়ে গর্ব করতো। পঞ্চম শ্রেনীতে কৃতিত্বের সাথে রেজাল্ট করে এসএসসি পরীক্ষায় কামারকাঠি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করে। সে সময়ে ওকে ভাল প্রাইভেটও দিতে পারিনি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথায় এবং তাদের সহযোগিতায় উপজেলার শহীদ স্মৃতি ডিগ্রী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করাই সাবনূরকে। কলেজের শিক্ষকদের আমাদের অবস্থার কথা খুলে বললে তারা মেয়েকে সহযোগিতা করেন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষক ও সহপাঠিরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে।

মা-বাবার সাথে সাবনূর
সাবনূরের মা সাংবাদিকদের সামনে কেঁদে বলেন, ‘এমন দিনও গেছে সংসারের অভাবের কারণে তার মেয়ে না খেয়েও কলেজ করেছে। এমনকি এখনও সে অভাব তাদের সংসারে লেগেই আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশুনাকালীন সময়ে বাবা আমাকে বিবাহ দেয়। তখন আমার পড়া লেখার খুব ইচ্ছা ছিল। তা পারিনি। তাই সেই থেকে মনে মনে পণ করি আমার ছেলে মেয়ে হলে তাদের ইচ্ছানুযায়ী পড়াশুনার সুযোগ দেব। সংসারে অভাবের কারণে আমি মানুষের বাড়ীতে মাঝে মাঝে কাজ করি। রাতভর ঘরে বসে পাটি ও হাত পাখা বুনন করি। অভাবের কারণে মেয়েকে কলেজে আসা যাওয়ার ভাড়াও দিতে পারিনি। মেয়ে আমার বাসা থেকে ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে হেঁটে গিয়ে কলেজ করতো। দুপুর হলে আবার পায়ে হেটে বাড়ীতে আসত। শহীদ স্মৃতি ডিগ্রী কলেজ থেকে ২১-২২ শিক্ষাবর্ষে মেয়ে আমার গোল্ডেন এ প্লাস পায়। ওর প্রাইমারি থেকে এ পর্যন্ত রেজাল্ট দেখে কলেজের মাহমুদ স্যার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার কথা বলে। এতে তিনি আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। এখন মেয়ের ভর্তি ও পড়ার খরচ কিভাবে চালাবো তা ভেবেই পাচ্ছিনা।’
রবিবার দুপুরে সাবনূরের বাড়ী গিয়ে দেখা যায়, মেয়ের মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় বাড়ীতে নেই কোন আয়োজন। সাবনূরের মা-বাবা চোখে আনন্দ দেখা গেলেও ভিতরে ডুবে আছেন গভীর দু:শ্চিন্তায়। এখন মেডিকেলের ভর্তির খরচ যোগাতে দিশেহারা বাবা বাবুল মোল্লা ও মা সাবিনা বেগম।
শিক্ষার্থী সাবনূর বলেন, আমি প্রাথমিক শিক্ষা জীবন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আগাতে শিক্ষক এবং সহপাঠিদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা পেয়েছি। আমি মেডিকেলে চান্স পেয়ে এখন ভর্তির জন্য অনেকটা দুশ্চিন্তায় আছি। মা বাবা এ নিয়ে মন খারাপ করে আছে। যদি মেডিকেলে ভর্তি হতে পারি, ডাক্তার হয়ে আমি আমার দিনমজুর পিতা ও মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবো। এ জন্য আমি আমার শুভাকাঙ্খি সকলের কাছে দোয়া চাচ্ছি।
নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোসারেফ হোসেন বলেন, ‘আমি তাদের আমার অফিসে আসতে বলেছি। ঘটনা শুনে সাবনূরের মেডিকেল ভর্তিতে যা খরচ হয় তা আমরা বহন করব।’
