প্রধান সূচি

পাইকগাছায় গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম

সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় উঠান। বিদ্যুৎ নেই, চলাচলের রাস্তা নেই, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। একটু জোরে বাতাস হলে ঘর নড়বড় করে। এমন দুরাবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন পাইকগাছা উপজেলার চারটি গুচ্ছগ্রামের ২৪০ পরিবার। গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ প্রকল্প তালিকায় বিদ্যুৎ, পানি ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সকল মৌলিক সুবিধা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

পাইকগাছা প্রকল্প বাস্তায়ন কমকতার কাযালয় সূত্র জানায়, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন গুচ্ছগ্রাম-২ প্রকল্পের আওতায় পাইকগাছা উপজেলার চারটি স্থানে ২৪০ গৃহহীন পরিবারকে পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেগুলো হলো, কাওয়ালি-২ প্রকল্পে ৫০ পরিবার, কাওয়ালি-৩ প্রকল্পে ৬০ পরিবার, বাইশারাবাদ প্রকল্পে ৮০ পরিবার ও ধোনার দোনিয়া প্রকল্পে ৫০ পরিবার। এতে চার ধাপে গৃহ, লেট্রিন নির্মাণ ও নলকূপ স্থাপনে ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা বরাদ্দ ছাড় করা হয়েছে। এছাড়া সুবিধাভোগীদের জন্য বৃক্ষ রোপন, পরিবার প্রতি একটি করে পরিবেশবান্ধব চুলা, পুকুর খনন, পুকুর ঘাট নির্মাণ, সংযোগ রাস্তা, মাল্টিপারপাস হল, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আলাদা এক কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ ছাড় করা হয়েছে। এর বাইরে মাটি ভরাট বাবদ প্রায় ৫শ’ মেট্রিক টন চাল ও গম বরাদ্দ ছাড় হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে মোট বরাদ্দের এক তৃতাংশ টাকা নয় ছয় করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, গৃহ নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় তা অল্প দিনের মধ্যে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রতিটি গৃহের ভিত (মেজে) সুবিধাভোগীদের নিজ খরচে মাটি ভরাট করতে হয়েছে। প্রকল্পে ২৪টি গভীর নলকুপ বসানোর কথা থাকলেও তা বসানো হয়নি। দেওয়া হয়নি উন্নত চুলা। বাসিন্দাদের যাতায়াতে সংযোগ রাস্তা নেই, বৃক্ষরোপন করা হয়নি। এছাড়া প্রকল্পের পুকুরের ঘাট নির্মাণের কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। ফলে নানামুখি অসুবিধার মধ্যে সেখানে বসবাস করছেন বাসিন্দারা।

বাইশার আবাদ গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা হাফিজুল সরদার বলেন, ‘যেভাবে ঘরগুলো আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে সেখানে বসবাস করা সম্ভব না। ঘরে উঠতে আমাদের প্রত্যেকের ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতি হয়েছে। এরপর রয়েছে যাতায়াত সমস্যা।’

সালেহা নামে আরেক সুবিধাভোগী বলেন, ‘আমার ঘরের প্রতিটি খুঁটিতেই ফাটল ধরেছে। দরোজা জানালাগুলোও নড়বড়ে। সব থেকে বড় সমস্যা যেডা তাহলো খাবার পানি আনতি তিন চার মাইল হাঁটতি হয়। এ জাগায় শেষ পর্যন্ত থাকতি পারবো কিনা বলতি পারিনে।’

কাওয়ালি-২ গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা রোজিনা খাতুন বলেন, ‘শুনিছি সরকার আমাগে বাস করার জন্যি সব রকম সুবিধে দেছে। কিন্তু এখানে আইসে দেখি সব কিছুতেই অসুবিধে। একটা পুকুর আছে তার ঘাট নেই। তা আবার বাইরের মানুষির কাছে লিজ দেছে। আমাগে থাকার জাগা নেই তাই মুখ বুজে পইড়ে আছি।’

প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ি বাস্তবায়ন কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সদস্য থাকার কথা। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তারা অভিযোগ করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ না করায় বেশিরভাগ অর্থ লোপাট হয়েছে।

গদাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী জুনায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের বাইশার আবাদ গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পটি ইউএনও নিজেই বাস্তবায়ন করেছেন। আমার কাছ থেকে কয়েকটি স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে মাত্র। তবে এ মুহুর্তে অনেক অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে।’

কাওয়ালি-২ ও কাওয়ালি-৩ গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে উপজেলার চাঁদখালি ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জোয়াদুর রসুল বাবু বলেন, ‘প্রকল্প দুটি আমার ইউনিয়নে বাস্তবায়ন হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি এ সম্পর্কে আমাকে অবগত করেননি। শোনা যাচ্ছে আমার স্বাক্ষরে প্রকল্পের মাটি ভরাটের বরাদ্দ উত্তলোন করা হয়েছে।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুলিয়া সুকায়না বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো সুবিধাভোগীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নিজেকে অসুস্থ জানিয়ে পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।

খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মো. আকতারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে আমি সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার আগে। এ জন্য এ সম্পর্কে আমার জানা নেই। গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা তাদের অসুবিধার কথা জানিয়েছেন। সে বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।’

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial