প্রধান সূচি

নাজিরপুরে ইউএনও বিরুদ্ধে দফাদার ও মহল্লাদার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

পিরোজপুরের নাজিরপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা’র (ইউএনও) বিরুদ্ধে দফাদার ও মহল্লাদার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে উৎকোচ গ্রহণ করে ইউএনও এ অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া অনিয়মের বিচার চাওয়ায় ইউএনও ক্ষিপ্ত হয়ে বিচার প্রার্থীর ভাইকে মিথ্যা ঘটনায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৩ মাসের সাজা প্রদান করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। বয়স জটিলতা ও জাল-জালিয়াতির অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই ছাড়াই লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরেও ইউএনও এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাদেরকেই নিয়োগ দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।

দুই নিয়োগ প্রত্যাশী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির অভিযোগ তুলে প্রতিকার চেয়ে পিরোজপুর জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। জেলা প্রশাসক অভিযোগের বিষয়টি জরুরী ভিক্তিতে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউএনওকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু ইউএনও ওই অভিযোগ আমলে না নিয়েই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একজন দফাদার ও ৭ জন মহল্লাদারকে নিয়োগ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে এ নিয়োগে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবী করেছে।

দফাদার পদে আবেদনকারী লিটন হাজরা অভিযোগ করে জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম সংক্রান্তে ডিসি’র কাছে তিনি লিখিত অভিযোগ করায় তার ওপর ইউএনও ক্ষিপ্ত হয়। এ কারণে নতুন নিয়োগ দেয়া দফাদার রাইমোহন বালার মাধ্যমে গত ৩ নভেম্বর তার ভাই রিপন হাজরাকে কৌশলে বাড়ী থেকে ডেকে ইউএনও’র কার্যালয়ে আনা হয় এবং তার কাছে ১০ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে দেখিয়ে ইউএনও নিজ কার্যালয়ে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন। বর্তমানে রিপন হাজরা কারাগারে রয়েছে। পরে এ নিয়োগ সংক্রান্তে আর কোথাও অভিযোগ করলে পরিনাম আরো খারাপ হবে বলে ওই পরিবারকে নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন লিটন হাজরার বৃদ্ধ পিতা জগবন্ধু হাজরা।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, স্বারক নং ০৫.১০.৭৬৭৬.০০৫.১১.০১০.১৯-৪৯০ (১২), তারিখ: ১ জুলাই ২০১৯ মোতাবেক উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নে ৫টি, দেউলবাড়ী ইউনিয়নে ২টি ও শাখারীকাঠী ইউনিয়নে ১টি সহ মোট ৮টি পদে দফাদার ও মহল্লাদার নিয়োগ দেয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে যাদেরকে নিয়োগ দেয়া হবে তা চূড়ান্ত করে রাখা হয় এবং চলতি বছরের ৬ আগস্ট ইউএনও’র কার্যালয়ে নামমাত্র মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়। কোন কোন প্রার্থীকে নেয়া হবে তা পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করা ছিলো বলে এ প্রতিনিধিকে জানান খোদ নিয়োগ বোর্ডের এক সদস্য।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনকারীদের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৩০ বছর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা ৮ম শ্রেণী পাশ উল্লেখ রয়েছে। তবে ভোটার তালিকা অনুযায়ী দফাদার পদে নিয়োগ পাওয়া রাইমোহন বালার বয়স ৩৯ বছর। ভোটার তালিকায় তিন জায়গায় আলাদা আলাদা ক্রমিকে তার একই নাম ঠিকানা রয়েছে। তবে তিন জায়গায় জন্ম তারিখ ভিন্ন-ভিন্ন। সর্বশেষ জন্ম তারিখ অনুযায়ী তার বয়স ২৫ বছর। এই বয়স দেখিয়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উপজেলার শ্রীরামকাঠী ইউজেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রাইমোহন বালার নবম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত বাঁধন বালা নামে একটি মেয়ে রয়েছে। তার বয়স ১৫ বছর।

মহল্লাদার পদে নিয়োগ প্রত্যাশী লিপসন বিশ্বাসের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মহল্লাদার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত দেবাশিষ বিশ্বাসের জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্ম তারিখ ২৩ জুলাই ১৯৮৪ উল্লেখ রয়েছে। এখানে তার বয়সও ৩৫ বছরেরও বেশী। তাছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ৮ম শ্রেণী পাশ উল্লেখ থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেইজের তথ্যানুযায়ী তিনি ৫ম শ্রেণী পাশ। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দেবাশিষ বিশ্বাস বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তন করে ওই পদে তিনি নিয়োগ নিয়েছেন বলে জেলা প্রশাসক বরাবরে আরেকটি লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।

উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য কেশব লাল বিশ্বাস বলেন, মালিখালী ইউনিয়নে দফাদার পদে নিয়োগ পাওয়া রাইমোহন বালা ও মহল্লাদার পদে নিয়োগ পাওয়া দেবাশিষ বিশ্বাস দু’জনেরই বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার জটিলতা রয়েছে। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের বয়স কম দেখানো হয়েছে। তাছাড়া আমাদের ইউনিয়নে ৬টি পদে নিয়োগে ইউপি চেয়ারম্যান মিঠু মন্ডল প্রায় ২০ লাখ টাকা বাণিজ্য করেছে। নিয়োগ পরীক্ষার ৩/৪দিন আগে স্ব-পরিবারে ইউএনও চেয়ারম্যানের বাড়ীতে রাতে ডিনার করেছেন। ওই দিনই এ নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান জানান, শাখারীকাঠী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে মহল্লাদার পদে নিয়োগ পাওয়া কামরুজ্জামান গাজীর কাছে এক লাখ টাকা ঘুষ নেয়া হয়েছে।

নিয়োগ বোর্ডের সদস্য নাজিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকারিয়া বলেন, নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে প্রার্থীর বয়স নিয়ে অভিযোগ ওঠলে ওই প্রার্থীকে আমি কোন নম্বর না দিয়ে সেখানে বয়স জটিলতা লিখে রেখেছিলাম। তাছাড়া নিয়োগ বোর্ডের সদস্য হিসেবে আমি চূড়ান্ত রেজাল্ট সীটে কোন স্বাক্ষরও করিনি। এছাড়া নিয়োগ বোর্ডের আরেক সদস্য উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন মিয়া জানান, নিয়োগ সংক্রানাত নানা বিষয় রহস্যজনক মনে হলে তিনিও চূড়ান্ত রেজাল্ট সীটে স্বাক্ষর করেন নি।

নিয়োগ কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোজী আকতার মুঠোফোনে এ প্রতিনিধিকে বলেন, “উৎকোচ গ্রহণের বিষয়টি সত্য নয়। তবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট অনুযায়ী তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের দাখিলকৃত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে কিনা এবং মোবাইল কোর্টে সাজার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফাইলপত্র না দেখে কিছু বলা যাবে না বলে ফোনের সংযোগ বিছিন্ন করে দেন।”

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial