কৃষি কাজে আবহাওয়া তথ্য-উপাত্ত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে ইউনিয়নে ইউনিয়নে চালু হয়েছে প্রকল্প
কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প নামে টেকসই কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রচারের কাজ শুরু হয়েছে।
এ প্রকল্পের অধীনে ইতিমধ্যে পিরোজপুর জেলার ৫১টিসহ দেশের ৪০৫১টি ইউনিয়ন পরিষদে একটি করে বৃষ্টি মাপক যন্ত্র ও আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার একটি কারিগরি সেমিনার থেকে দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞগণ বাংলাদেশে কৃষি আবহাওয়া সেবার মান মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে বৃদ্ধির সুপারিশ করেন। এর ধারাবাহিকতায় বিশ^ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একটি যৌথ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ ওয়াটার এন্ড ক্লাইমেট সার্ভিস রিজিওনাল প্রজেক্টের আওতায় এই পৃথক তিনটি সংস্থা তিন কম্পোনেন্ট (অঙ্গ) নিয়ে তথ্য ও বার্তা আদান প্রদানের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে থাকবে কৃষি আবহাওয়া পোর্টাল স্থাপন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত, তথ্য উপাত্ত প্রস্তুত করে কৃষি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। সে লক্ষে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতে দেশের ৪০৫১টি ইউনিয়ন পরিষদে হ্যান্ড হেল্ড অটোমেটিক রেইন গজ (বৃষ্টি মাপক চোঙ) এবং কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক এনালগ ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কৃষি বিভাগের উপ সহকারী কৃষি অফিসারদেরকে (এসএএও) ৬৬৬৪টি ট্যাব (ইন্টারনেট কানেকশনসহ) সরবরাহ করা হয়েছে। মোবাইল এ্যাপের মাধ্যমে সদর দপ্তর থেকে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত মৌসুম ভিত্তিক কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক প্রাপ্ত তথ্য প্রদান করা হবে। এছাড়া ফিডব্যাক মেকানিজমের মাধ্যমে মাঠের সমস্যা জানা এবং প্রয়োজনীয় সমাধান প্রেরণ করা হবে।
সম্প্রতি পিরোজপুর সদর উপজেলার ১নং শিকদার মল্লিক ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ঘুরে দেখা গেছে, এখানে স্থাপিত একটি আবহাওয়া বিষয়ক ডিসপ্লে বোর্ডে কৃষি আবহাওয়া পূর্বাভাস বিষয়ে গত তিন দিন এবং আগামী তিন দিনের মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ু প্রবাহ ও আলোক ঘন্টার তথ্য লেখা আছে। এছাড়া তিনদিনের আবহাওয়া বিষয়ক কৃষিবার্তা ও বিপদ সংকেত রয়েছে। কয়েকজন কৃষক এসব তথ্যাদি দেখছেন। এ সময় জুজখোলা গ্রামের কৃষক শ্যামল মিস্ত্রি বলেন, গ্রামে বসে কৃষি বিষয়ক আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্যাদি জানতে পারলে আমাদের চাষাবাদে সহজ হবে।
শিকদার মল্লিক ব্লক এলাকায় কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি অফিসার সবুজ কুমার দাস জানান, ওয়েদার সেন্স এ্যাপের মাধ্যমে দৈনিক বৃষ্টিপাত পরিমাণ (মিলিমিটার) এবং বামিস পোর্টাল এ্যাপ ব্যবহার করে কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক পূর্বাভাসের তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়। এ বোর্ডে সদর উপজেলা কৃষি অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার ও সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। যাতে করে কৃষক যে কোন তথ্য বা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান জেনে নিতে পারেন। কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশি^ক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ কাজটি ব্যাপক ও জনগুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে আবহাওয়া ও নদ-নদীর সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কিত উন্নতমানের এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যাদি কৃষকের কাছে পৌঁছানো এবং এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এর ফলে দ্রুত কৃষক পর্যায়ে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত কৃষি আবহাওয়ার তথ্য পৌঁছাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব অভিযোজনে ক্রমশঃ কৃষকগণ সক্ষম হয়ে উঠবেন। এতে করে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা টেকসই হবে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমবে। প্রকল্প পরিচালক জানান, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত দৈনিক কৃষি আবহাওয়া ও নদ-নদীর তথ্যাদি বামিস (বাংলাদেশ এগ্রো-মেটেরোলজিক্যাল ইনফরমেশন স্টিটেম) পোর্টালে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত প্রস্তুত করে পর্যায়ক্রমে তা বিভিন্ন সম্প্রসারণ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এছাড়া উল্লিখিত বামিস পোর্টালে থাকা এডভাইজারি তথ্যাদি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও মাঠে এসএএওদের কাছে প্রচার করা হবে। পাশাপাশি ৩০ হাজার কৃষক প্রতিনিধিদের কাছে এডভাইজারি প্রচার এবং এর ফিডব্যাক বিশ্লেষণ করা হবে। দেশের ১৪টি অঞ্চল ও ৬৪টি জেলায় কৃষক আবহাওয়া সেবা কক্ষ স্থাপন করা হবে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে।
পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু হেনা মোহাম্মদ জাফর বলেন, প্রকল্পটি খুবই সময় উপযোগী। নিজ ইউনিয়নে বসে কৃষকগণ সামগ্রিক কৃষি আবহাওয়ার চলমান অবস্থা বিবেচনা করে পরামর্শ অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, এ প্রকল্প সরকারের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এবং এসডিজি বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে পিরোজপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শিপন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে কৃষি আবহাওয়ার ব্যাপক তথ্য পৌঁছে যাবে। এরফলে কৃষক উপকৃত হবেন এবং ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলায় সক্ষম হয়ে উঠবেন। যা আগামীর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকিমুক্ত রাখবে।
