পিরোজপুরে অনিরাপদ খাদ্যের কু-প্রভাবে নানা রোগের কবলে শিশু শিক্ষার্থীরা
পিরোজপুর জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে একশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা অনিরাপদ খাবার বিক্রি করছে। আর স্কুলের সামনে বিক্রি হওয়া এসব অনিরাপদ খাবার কেযে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা নানা আন্ত্রিক রোগের কবলে পড়ছে।
বিদ্যালয়গুলোর সামনে বাহারী রংয়ের খোলা খাবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিক্রি রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে শিশু স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে আশংকা দেকা দিয়েছে।
পিরোজপুর জেলা সদর, উপজেলা সদরসহ জনবহুল এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এবং আশেপাশে নানা মুখরোচক খাবার অবাধে বিক্রি হলেও সরকারি বা সামাজিকভাবে এসব রোধ করার কোন উদ্যোগ নেই।
সম্প্রতি পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অনুষ্ঠিত অভিভাবক সমাবেশে বিদ্যালয় অভ্যন্তরে ও সামনে থাকা ফুচকা-চটপটির দোকান, আচারের দোকানসহ বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান তুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবকরা। পাশাপাশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শহরের সচেতন নাগরিক সমাজ।
অন্যদিকে, পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বিভিন্ন জায়গায় ক্লাস চলাকালে এবং বিকেলে এসব দোকানের হাট বসে।
বিদ্যালয় শুরু ও শেষে শিশু শিক্ষার্থীরা ফুচকা, চটপটি, ঝাঁলমুড়ি, আচার, ঘরে তৈরী চিপ্সসহ নানা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে দল বেঁধে ছুটে যায় এসব দোকানে। ফুচকা-চটপটিতে যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে ‘টক লবন’ নামে পরিচিত সোডিয়াম সাইক্লোমেড জাতীয় এক ধরণের কেমিক্যাল রয়েছে। ফুচকা বিক্রেতারা বাজার থেকে এ উপাদানটি সস্তায় কিনে তেতুলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। এ দ্রব্যটি শরীরের জন্য বিশেষ করে শিশুদের দেহে দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির সৃষ্টি করে।
পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহরের রাস্তার পাশে বিশেষ করে স্কুল কলেজের সামনের ঝাঁলমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, ডালপুরি ও আচারের স্বাস্থ্য ঝুঁকি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে প্রতিনিয়ত। এসব খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে রাষ্ট্রের রেফারেন্স প্রতিষ্ঠান “ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যবরেটরিতে পরীক্ষা করে কৃত্রিম রং, ইস্ট, ই-কোলাই, কলিফর্ম, মাইকোটক্সিন ও সালমোলিনা’র মত মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদানের সন্ধান মিলেছে যা ভয়াবহ শঙ্কার কারণ। এসব খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। সালমোলিনা টাইফয়েডের জীবাণু। নষ্টমুড়ি, নষ্ট ফুচকা, নষ্ট পুরি থেকে মাইকোটক্সিন তৈরি হয়, যা ডায়রিয়া সৃষ্টি করে। আবার ফুচকায় মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। কলিফর্ম মূলতঃ বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া যা ভাইরাস ও প্রোটোজোয়ার মত প্যাথোজেন সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। কলিফর্ম গোত্রের আরেকটি ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাই মানবদেহে দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, মাথাব্যাথা, বমিভাব, পেটব্যাথা, জ¦রসহ নানা উপসর্গ সৃষ্টির পাশাপাশি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব মানুষের হেমালাইটিক সিনড্রোম দেখা দিতে পারে যা রক্তের লোহিত কণিকা ধ্বংস করে। এই ব্যকটেরিয়ার কারণে মূত্রথলি সংক্রমিত হয়ে কিডনিতে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে। এসব জীবাণু রক্তে মিশে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
পিরোজপুর সিভিল সার্জন ডা. ফারুক আলম খোলা জায়গায় অনিরাপদ খাবার বিক্রির কুফলের কথা স্বীকার করে বলেন, এটা শিশু শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। এসব খাবার বন্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার বিধান রয়েছে। তবে অল্প পুঁজি নিয়ে গরীব মানুষ সাধারণতঃ এ খাবারের ব্যবসা করে বলে তাদের বিরুদ্ধে তিন লাখ টাকার মত বড় অংকের জরিমানা আদায়ে ভ্রাম্যমান আদালতকে মানবিক কারণে অভিযান চালাতে দেখা যায় না।
জেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক স্বপন কুমার সিকদার জানান, পিরোজপুর পৌরসভায় স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূণ্য রয়েছে। সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শককে পৌরসভারও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অনিরাপদ খাদ্য বিক্রি রোধে পৌর এলাকায় তৎপরতা বৃদ্ধি করা হবে।
