প্রধান সূচি

খুলনা-৬ আসন জোড়ালো প্রচারণায় আওয়ামী লীগ ॥ কৌশলে বিএনপি-জামায়াত জোট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই খুলনা-৬ আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়াচ্ছে। প্রতীক বরাদ্দের পরপরই ভোট যুদ্ধে নেমে পড়েছে প্রার্থীরা। পাইকগাছা-কয়রার বিভিন্ন হাট-বাজার ও রাস্তার উপর প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর সমর্থকদের মিছিল, সভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচারণবিধি লঙ্ঘন, কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পোষ্টার লাগানো নিয়ে মারামারিসহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা এগিয়ে চলেছে। এরপরও উৎসব মূখর পরিবেশে এ আসনে প্রচার প্রচারণা চলছে। খুলনা-৬ আসনে নির্বাচন হবে দ্বিমূখী। তাই নৌকা ও ধানের শীষ এর প্রার্থীদের প্রচারকে কেন্দ্র করে উত্তাপ বেশি।
খুলনা-৬ আসনে (পাইকগাছা-কয়রা) ৭ জন প্রার্থী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আওয়ামী লীগের আক্তারুজ্জামান বাবু (নৌকা), জামায়াতের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির শফিকুল ইসলাম মধু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের গাজী নূর আহমেদ (হাতপাখা), জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন (গোলাপ ফুল), কমিউনিস্ট পার্টির সুবাস চন্দ্র সাহা (কাস্তে) ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির মির্জা গোলাম আজম (টেলিভিশন) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।
খুলনা-৬ আসনের কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ৬২টি ভোট কেন্দ্রে ৩৩০টি বুথ রয়েছে। এখানে ভোটার রয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯০৪ জন। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ৭৯১ জন পুরুষ এবং ৭৮ হাজার ১১৩ জন নারী ভোটার। আর পাইকগাছা উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার ৭৯টি ভোট কেন্দ্রে ৪৫২টি বুথ রয়েছে। এখানে ভোটার রয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৬ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার ৯৭৭ জন পুরুষ এবং ১ লাখ ৭ হাজার ৫৮৯ জন নারী ভোটার।
বিগত নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ১৯৭৩ সালে এ আসনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা স. ম. বাবর আলী। ১৯৭৯ সালে বিএনপির শেখ রাজ্জাক আলী এবং ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মোমিন উদ্দীন আহমেদ নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন জামায়াতের শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ মো. নূরুল হক জয়লাভ করেন। ২০০১ সালে আবার জামায়াতের শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস সংসদ সদস্য হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সোহরাব আলী সানা এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে একই দলের আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মো. নূরুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
খুলনা-৬ আসনে ক্ষমতাসীন দল নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আখতারুজ্জামান বাবু প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে তার নির্বাচনী প্রচারণায় নিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, রাস্তা-ঘাট, অলি-গলিতে নৌকা প্রতিকের পোস্টার শোভা পাচ্ছে।
জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়রা-পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তিনি কারাবন্ধী রয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে দলের নেতাকর্মীরা নিরবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের আক্তারুজ্জামান বাবু ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ দু’জনই নতুন প্রার্থী।
নির্বাচনে প্রতিটা দলেই চলছে জয়লাভের কলাকৌশল ও সাধারণ ভোটারদের সাথে প্রকাশ্যে ও গোপনে গণসংযোগ।
খুলনা-৬ আসন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত। দেশ স্বাধীনের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে চারবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিএনপি জোট আটঘাট বেঁধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় নির্বাচন অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
খুলনা-৬ আসনে প্রার্থী হিসেবে আক্তারুজ্জামান বাবু নতুন হলেও রাজনীতিতে অভিজ্ঞ আছে বলেই মনে করছেন তৃনমুল নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করেন দলের স্বার্থে এবং উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে আসনটি ধরে রাখার জন্য দলীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। তবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন কন্দল রয়েছে প্রকট। একাধিক গ্রুপে পাইকগাছা আওয়ামী লীগ বিভক্ত। দলের পদ-পদবী, আগামী নির্বাচনে ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলার জন্য নেতারা বেশি তৎপর রয়েছেন বলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানান। বিভিন্ন নির্বাচনী বর্ধিত সভায় এ বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে। বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রচার-প্রচারণা, গণসংযোগে অব্যাহত রয়েছে। এসব প্রচারণার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতটা প্রধান্য পাচ্ছে, সে হিসেবে সাধারণ ভোটারের সাথে যোগাযোগ কম হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিগত দিনের বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারী ও অনুপ্রবেশকারীরা দলে প্রধান্য ও নেতৃত্ব দেওয়ায় দলের ত্যাগী নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ অবস্থা থেকে দলকে সু-সংগঠিত করতে সংসদ সদস্য প্রার্থী আকতারুজ্জামান বাবুকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারলে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। তৃনমূল আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীন ও তরুন ভোটারদের সাথে আলাপচারিতায় একটা বিষয় স্পষ্ট ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল নিষ্পত্তি না হলেও প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণে ব্যাপক সাড়া পড়ছে। দলীয় কোন্দল ভুলে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশও দিয়েছেন।
কয়রা জামায়াত ইসলামীর দূর্গ হিসেবে পরিচিত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের খুলনা মহানগর আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। এ আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য বিএনপি জোট কৌশলগত ভাবে নির্বাচনী পরিচালনা করে চলেছেন। সভা-সমাবেশে তেমন একটা দেখা না গেলেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে কৌশলে ভোট প্রার্থনা অব্যাহত রয়েছে। এ আসনটি জামায়াতের ঘাঁটিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলের এ সুযোগে সুফল ঘরে তুলতে চায় বিএনপি জোট। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial