ব্লাকমেইল করে ডলারসহ লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ
পিরোজপুর সরকারী বালক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেনীর তিন ছাত্র গ্রেফতার
গুম, প্রাণনাশের হুমকি, নগ্ন ছবি তুলে প্রকাশ করাসহ নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে ৭ম শ্রেনির কতিপয় ছাত্র ৪র্থ শ্রেনির ১৫জন ছাত্রের কাছ থেকে ডলার-সৌদি রিয়ালসহ কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় পিরোজপুরে তিন ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে খুন-জখম, মারধর, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে ফৌজদার আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পিরোজপুর সরকারি বালক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেনির ছাত্র এ গ্রেফতারকৃতরা হলো মো. তামিম, দিগন্ত মৃধা ও তানভির আহমেদ হৃদয়। এ তিনজনসহ অজ্ঞতানামা ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাতে সদর থানায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ মধ্যরাতে তাদের নিজ নিজ বাড়ী থেকে গ্রেফতার করে বলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম জিয়াউল হক জানান।
এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে জেলা শহরের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিরোজপুর সরকারি মাধ্যমিক বালক বিদ্যালয়ে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত প্রায় দুই মাস ধরে ৭ম শ্রেনির দিবা শাখার ছাত্র তামিমের নেতৃত্বে হৃদয়, দিগন্ত, সাইফসহ ৭/৮ জনের একটি চক্র এ অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। হত্যা, গুম, দৈহিক নির্যাতন, স্কুলের টয়লেটে মোবাইলে নগ্ন ছবি তুলে কোন মেয়ের নগ্ন ছবির সাথে জুড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছিল। কিছু ছাত্র ব্লাকমেইলিংয়ের এ ফাঁদে পড়ে বাড়ি থেকে মা-বাবার আয়রণ সেফ বা স্টিল আলমারিতে গচ্ছিত টাকা, ডলার ও রিয়াল গোপনে এনে ওই চক্রের হাতে তুলে দিত। গত মঙ্গলবার সকালে স্কুলে অভিযোগ দিতে আসা অভিভাবকদের মধ্যে ৪র্থ শ্রেনির ছাত্র মাহিম মল্লিকের মা সালমা আক্তার জানান, তার স্বামী মামুন মল্লিক সৌদি প্রবাসী হওয়ায় বাসায় ডলার ও রিয়ালসহ নগদ অর্থ ছিল। এই কিশোর অপরাধী চক্র বিভিন্ন সময় তার ছেলের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়। ভীতি ও চাপের মুখে মাহিম টাকা ও রিয়াল নিয়ে ওই চক্রের হাতে তুলে দেয়ার এক পর্যায়ে ৪র্থ শ্রেনীর ছাত্র ও অভিভাবকদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পায়। তখন ছেলেকে সালমা আক্তার চাপ দিলে প্রকৃত চক্রের হদিস পাওয়া যায় এবং জানা যায় এ চক্রের নেতা তামিম শহরের রাজারহাটের বসবাসরত আরেক প্রবাসী শহীদুল ইসলাম সিকদারের ছেলে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিলীপ কুমার মৃধার ছেলে দিগন্ত ও শহরের আনসার আলী খোকনের ছেলে হৃদয় একই চক্রের সদস্য। তাদের পিছনে এক বড় ভাই রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তারা স্বীকার করেছে। এই বড় ভাই শহরের নড়াইলপাড়া নিবাসী এবং স্থানীয় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র।
আটক তামিম সম্পর্কে তারই স্কুলের এক শিক্ষক জানান, সে ৬ষ্ঠ শ্রেনিতে প্রমোশন না পেয়ে একটি ছাত্র সংগঠনের সদস্য হওয়ায় নেতাদের হস্তক্ষেপে ৭ম শ্রেনিতে উঠে। সে স্কুলে একজন সিনিয়র শিক্ষক মনিরুল ইসলামকে ভূড়ি নামিয়ে নেয়ার হুমকিও দিয়েছিলো। পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের এক শিক্ষক দম্পত্তির ছেলেও এই চক্রের খপ্পরে পড়ে বাসা থেকে গোপনে প্রায় ৩০ হাজার টাকা নিয়ে তাদের হাতে তুলে দেয়। শিক্ষক দম্পত্তি জানান, গত সোমবার এভাবে সাড়ে তিন হাজার টাকা মা-বাবাকে না জানিয়ে তামিমকে এনে দেয় তাদের ছেলে। আরও জানা যায়, এ ঘটনা যদি ভিকটিমরা প্রকাশ করে তাহলে তাদের হত্যা বা গুম করার হুমকি দেয়া হতো। এ ঘটনায় ১০জন অভিভাবক জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানালে পুলিশ সুপারের নির্দেশে থানায় মামলা হয়। ৪র্থ শ্রেনীর ছাত্র মাহিম মল্লিকের মা সালমা বেগম মামলার বাদী হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪র্থ শ্রেনীর কমপক্ষে ১৭ জন ছাত্র ৭ম শ্রেনীর ঐ অপরাধী চক্রের মারধর, হুমকি ও ভয়ভীতির শিকার হয়ে বাড়ি থেকে অভিভাবকদের অগোচরে টাকা এনে তাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত স্কুল ছাত্রদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার বিষয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান এ ব্যাপারে বলেন, ঘটনাটি শোনার পর তিনি উভয় পক্ষের ছাত্রদের অভিভাবকদের ডেকে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করেছেন। এ ধরণের অপরাধ সমাজে অত্যন্ত বিরল এবং সামাজিক অবক্ষয় ও শিশুদের পারিবারিক উদাসীনতার মধ্যে লালিত-পালিত হওয়ার পরিনতি বলে তিনি মন্তব্য করেন। অভিযুক্ত ছাত্রদের বিষয়ে বিদ্যালয় প্রশাসন থেকেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। যাতে করে কোন ধরনের অপরাধ অন্য কোন ছাত্র করতে সাহস না পায়।
পিরোজপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবীর জানান, অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে সদর থানার ওসিকে ইতিমধ্যে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গৌরঙ্গ চন্দ্র হালদার বলেন, তারা এ ঘটনায় অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। জেলা প্রশাসকের সাথে বৈঠকের পর এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা কঠোরও হতে পারি না। তবে বিদ্যালয়ের নানা সমস্যা আছে চেষ্টা করব তা কাটিয়ে ওঠার।
এদিকে, বোরহান মল্লিক নামের এক অভিভাবক জানান, সরকরী বালক বিদ্যালয়ের পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের শৃংখলা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বিদ্যালয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করাসহ প্রশাসনিকভাবে শিক্ষকদের আরো কঠোর হওয়া উচিৎ। সেই সাথে বিদ্যালয়ে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে কার্যক্রম নজরদারী করারও আহবান জানান তিনি।
