ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় মোরা || ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত
কন্ঠ রিপোর্ট :
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ তীব্র আকার ধারণ করে বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে। এটি মঙ্গলবার সকাল নাগাদ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।
এজন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ইতোমধ্যে সারাদেশে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ মোকাবেলা সব ধরণের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। উপকূলীয় এলাকায় সন্ধ্যার মধ্যে লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাত মোকাবেলায় পিরোজপুর জেলাব্যাপী নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জেলা প্রশাসনসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দুর্যোগ মোকাবেলায় সোমবার প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় ‘মোরা’ মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সেখ এর সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সভাকক্ষে দুর্যোগ মোকাবেলায় এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলার সাইক্লোন শেল্টারগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের স্বেচ্ছাসেবকসহ বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সন্ধ্যার আগে সড়িয়ে নেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সভায়। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম রাখার নির্দেশনা দেয়া হয় স্বাস্থ্য বিভাগকে।
এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও কাছাকাছি এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আরও সামান্য উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছিল।
তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘন্টায় ৮৯ থেকে ১১৭ কিলোমিটারের মধ্যে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম রুহুল কুদ্দুস জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৮৫ কি.মি. দক্ষিণে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৩০৫ কি.মি. দক্ষিণে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৫০ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৭০ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থান করছিল। এটি আরও ঘণীভূত ও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মঙ্গলবার সকাল নাগাদ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ এর অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও কাছাকাছি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় এবং সমুদ্র বন্দরগুলোর উপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬২ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘন্টায় ৮৯ কি.মি. যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১১৭ কি.মি. পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের কাছাকাছি এলাকায় সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে বলেও জানান আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে সোমবার দুপুরের পর পিরোজপুরে বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে। তবে বিকেলে বৃষ্টি কমে যায়। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের মানে হল, বন্দর প্রচন্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ৮৯ কি.মি. বা এর বেশি হতে পারে। প্রচন্ড ঝড়টি বন্দরের উপর বা নিকট দিয়ে উপকূল অতিক্রম করবে।
তবে মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে ৮ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোও ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে বলে আবহাওয়া বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর আরও জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ অতিক্রমকালে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর জেলা এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিসহ ঘন্টায় ৮৯ থেকে ১১৭ কি.মি. বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে উপকূলীয় জেলা পিরোজপুরে সন্ধ্যার আগ থেকেই থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং বন্ধ রাখা হয়েছে কয়েকটি এলাকার বিদ্যুত সংযোগ।
জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সেখ জানান, প্রতিটি উপজেলায় জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার মাধ্যমে ৭টি উপজেলার সকল ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়নকেন্দ্র খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সকল বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোকে উদ্ধার কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা হচ্ছে পিরোজপুর সদর, মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া ও ইন্দুরকানি উপজেলা।
জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মঠবাড়িয়া উপজেলাধীন বেতমোড় রাজপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন আকন জানান, তার ইউনিয়নে বলেশ^র নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইউনিয়নের সবগুলো আশ্রয়নকেন্দ্র খোলা রাখা হয়েছে এবং এলাকাবাসীকে সচেতন করার জন্য মাইকিং অব্যহত আছে।
এদিকে, আবহাওয়ার সতর্ক বার্তা জানিয়ে রাতে পিরোজপুর শহরে মাইকিং করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ভোররাতের দিকে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত হানতে পারে।
