কঁচা নদীতে বঙ্গমাতা সেতু চালু : একদিকে আনন্দ উল্লাস, অন্যদিকে চোখে জল
‘দোকানদারী করে খাইয়া-পইররা মোটামুটি ভালই ছিলাম। এহনতো ফেরি বন্ধ। এহানে কোন গাড়ি-ঘোড়া নাই, লোকজন নাই। এখন আর কি করমু, দোকারঘর ভাইঙ্গা চুইরগা বাড়ি নিয়া যাইতেছি।’- এভাবেই কথাগুলো বললেন পিরোজপুরের কঁচা কদীর পশ্চিম পাড়ের কুমিরমারা ফেরিঘাটের খাবার হোটেল ব্যবসায়ী মো কবির সেখ।
তিনি বলেন, গত ১৮ বছর ধরে ফেরিঘাটে কাবার হোটেলের ব্যবসা করে পরিবার, পরিজন নিয়ে জীব জীবিকা চালাতেন। এখন ফেরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দু:চিন্তায় পড়েছি। কি করবো? কোথায় যাবো? পরিবার পরিজন নিয়ে কিভাবে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকবো তা ভেবে কূল পাচ্ছি না’।
ফেরিঘাটের চা দোকানদার বায়েজিদ সেখ বলেন, ফেরি বন্ধ হওয়ার পরে এখানকার প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। যা দু’একটা খালা আছে তাও বন্ধ হয়ে যাবে। এখানকার সব ব্যববসায়ীরই ক্ষতি হয়েছে। কেননা ফেরি বন্ধ হওয়ায় এখানে কোন লোক আসেনা। আমরা চেষ্টায় আছি অন্য কোথাও গিয়ে দোকান দিয়ে বা অন্য কোন ব্যবসা করা যায় কিনা।
কুমিরমারা ফেরিঘাটের মুদি মনোহরি ব্যবসায়ী সত্তরোর্ধ মো. রুস্তুম আলী সেখ বলেন, কঁচা নদীতে ২৮ বছর আগে ফেরি চলাচল শুরু করেছে। আর ২৫ বছর ধরে এই কুমিরমারা ফেরিঘাটে ব্যবসা করে আসছি। এতোদিন ফেরিঘাটকে ঘিরে রাতদিন হাজার হাজার লোকের সমাগম ছিল। প্রতিদিন শত শত যানবাহন পারাপার হতো। আর এখন সেতু চালু হওয়ার দু’দিনের মধ্যেই ফেরিঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছে। দু’দিন আগেও যেখানে ছিল মানুষের কোলাহল, হকারদের হাকডাক, গাড়ির হর্ন, ফেরির হুইসেল। আল্লার কি নির্মম পরিহাস- সেই ঘাট এখন যেন এক নির্জন জনপদ। লোকজন নেই, ক্রেতা নেই। কিভাবে আর এখানে ব্যবসা চালিয়ে রাখবো। অন্য কোথাও গিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করবো তাতেও তো অনেক পুঁজির দরকার। কম হলেও ১০/১২ লাখ টাকার দরকার, তো সে পুঁজি তো আর নেই। তাই ভাবছি বাকী জীবনটা এখানেই দোকান রেখে যা বেচা বিক্রি হয় তা দিয়েই সন্তুষ্ট থাকবো। তিনি আরও বলেন, নদীর দুই পাড়ের ফেরিঘাটের কমপক্ষে ১২০ থেকে ১২৫ জন বিভিন্ন ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের ক্ষতি হলেও সেতু নির্মানের ফলে লাখ লাখ মানুুষের তো ভাল হয়েছে, লাভ হয়েছে। আমাদের ক্ষতির কারণে খুশি হতে না পারলেও লাখ লাখ মানুষের খুশিতে আমরাও খুশি।

কুমিরমারা ফেরিঘাটের মাছ বিক্রেতা কালাম শেখ বলেন, কুমরিমারা ফেরিঘাটে আমরা বেশ কয়েকজন আছি যারা এখানকার কঁচা নদীর তাজা ইলিশ, পোমা, রামছোস, গলদা চিংড়ি মাছ বিক্রি করে আসছিলাম। এটাই ছিল আমাদের রুটি রুজির মাধ্যম। আমাদের বেশির ভাগ ক্রেতা ছিলেন ফেরিতে চলাচল করা মানুষজন। গাড়ি যখন ফেরির জন্য অপেক্ষা করতো, তখন অনেকে ঘাটে নেমে কঁচা নদীর তাজা ইলিশসহ নানা ধরণের মাছ কিনে নিতেন। এখন সেতু চালু হওয়ায় এখানে আর কোন লোকজন আসছে না। মাছও বিক্রি হচ্ছে না। মাছের দোকানটি সেতু এলাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে ফেরিঘাটের মতো সেখানে বেচাকেনা হবে না। কেননা সেতু দিয়ে গাড়ি চলার সময় তো থামার সম্ভাবনা নেই।
নবনির্মিত বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর পূর্ব পাড়ের বেকুটিয়া ফেরিঘাটের পান-সিগারেট বিক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, ১৫/১৬ ধরে এই বেকুটিয়া ফেরীঘাটে পান-সিগারেটের ব্যবসা করে জীবন জীবিকা চালাতাম। একখ সেতু চালু হওয়ায় আমাদের ব্যবসা শেষ। আমি অসুস্থ মানুষ, কোথায় গিয়ে কি করবো তাও ভেবে পাচ্ছি না। হতাশার মধ্যে আছি। সাজানো সংসার গড়তে অনেক সময় লাগে, ভাংতে এক মিনিটও সময় লাগে না। আমাদের অবস্থাও হয়েছে তাই। রবিবার সেতু উদ্বোধনের দিন সেখানে সকলে আনন্দ উল্লাস করেছেন, আর আমাদের এই ফেরিঘাটের ব্যবসায়ীদের চোখে ছিল কান্না। এখন কি করবো তা একমাত্র আল্লাই জানেন। কিছু তো আর করার নেই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। দশের লাঠি একের বোঝা। এখন ব্রিজ হয়েছে, দেশের উন্নতি হয়েছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নতি করতেছেন, দেশের মানুষের ভাল হয়েছে, এজন্য আমরা খুশি। তবে আমরা যে পঙ্গু হয়ে গেছি তা তো আর কেউ দেখবে না। সরকার যদি আমাদের এই ফেরিঘাটের ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু করেন, কোন সহায়তা করেন, তাহলে হয়তো নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবো। তিনি বলেন,
বেকুটিয়া ফেরিঘাটের ট্রলার চালক শাহীন হাওলাদার বলেন, আমরা এখন পথে বসে গেছি। আগে নদী পারপারে ট্রলার চালিয়ে সংসার চালাতাম। এখন সেতু চালু হওয়ায় ফেরিঘাট নি:প্রাণ হয়ে পড়েছে। নদীর দুই পাড়ের ট্রলার শতাধিক ট্রলার চালক কর্মহীন পড়েছে। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কিভাবে জীবন জীবিকা চালাবো, ছেলে মেয়েদের কিভাবে লেভাপড়া করাবো তা নিয়ে হতাশার মধ্যে আছি। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘স্যার-ভাই, আমাদে এই অসহায় আমুষদের জন্য কিছু একটা করেন। প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের জন্য কিছু একটা করতে বলেন। নইলে তো আমরা বাঁচতে পারবো না।

এদিকে মঙ্গলবার পিরোজপুর সদর উপজেলার কুমিরমারা ফেরি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কুমিরমারা প্রান্তের সেতুর পল্টন, গ্যাংওয়েসহ ফেরিগুলো সড়িয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। যন্ত্র দিয়ে ফেরির গ্যাংওংে, পল্টুন বেঁধে রাখার শিকল, ষ্টিলের রুফ কেটে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে সড়ক বিভাগের বরিশাল সেতু কর্তৃপক্ষের ওয়েল্ডার মো. আশরাফ আলী হাওলাদার জানান, ফেরির কুমিরমারা প্রান্তের পল্টুন, গ্যাংওয়ে খুলে বেকুটিয়া প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ পাড়ের ফেরিগুলোও বেকুটিয়া পান্তে নিয়ে যাওয়া হবে। আপাতত এগুলো সব সেখানে নিয়ে রাখা হবে। পরবর্তীতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পিরোজপুরের কঁচা নদীর উপর নবনির্মিত বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুটি গত গত ৪ সেপ্টেম্বর উদ্বোদনর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এদিন সকাল ১১টায় গণভবনের চামেলী হল থেকে ভার্চ্যয়ালী যুক্ত হয়ে সেতু উদ্বোদন করেন। সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে কঁচা নদীর দুই পাড়ে সুধী সমাবেশেসহ ব্যাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রায় দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৪৫ ফুট প্রশস্ত এ সেতুতে মোট ব্যয় হয়েছে ৮৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৫৪ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে চায়না সরকার। বাকী ২৩৫ টাকা ব্যয় করছে বাংলাদেশ সরকার।
সেতুটি ১০টি পিলার এবং ৯টি স্প্যানের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি বক্স গার্ডার টাইপের সেতু। ৯টি স্প্যানের মধ্যে ৭টি ১২২ মিটার এবং ২টি ৭২ মিটার স্প্যান রয়েছে। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৯৯৮ মিটার এবং এ্যাপ্রোচ সেতুর দৈর্ঘ্য ৪৯৫ মিটার। এছাড়া সেতুর দুই পাড়ে রয়েছে ১ হাজার ৪৬৭ মিটার এ্যাপ্রোচ সড়ক।
