স্বপ্নের পদ্মা সেতু পেরিয়ে পিরোজপুরে এলো যাত্রীবাহী পরিবহন
দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাঙ্গালির স্বপ্নের পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নানা বাঁধা বিপত্তি, দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রমত্তা পদ্মার বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সেতুটি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নয়ন শুরু হয়েছে।
ফেরী ও লঞ্চে পদ্মা নদী পাড়ির অপেক্ষায় বসে থেকে লাখ লাখ মানুষের সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অজস্র কর্মঘন্টা হারিয়ে গেছে জীবন তাদের থেকে, কত প্রাণ এই নদী কেড়ে নিয়েছে, কত লঞ্চ, কত ট্রলার, কত স্পীডবোট, কত নৌকা ডুবেছে, কত কোটি টাকার কাঁচামাল ফেরী পারাপারের অপেক্ষায় থেকে পঁচে গিয়ে কত ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়েছে, উন্নত ও জরুরী চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য ফেরীঘাটে অপেক্ষায় থেকে কত প্রিয়জন হারিয়েছে, কত বেকারের চাকুরীর ইন্টারভিউ’র সময় পেরিয়ে জীবন হয়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন এই পদ্মা পাড়ে বসে থেকে। ধীরে ধীরে এসব স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে। আর সব কিছুর অবসান হলো পদ্মা সেতু নির্মাণ ও উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।
মানুষের পাহাড়সম বিড়ম্বনার অবসান শেষে আজ রবিবার পদ্মা সেতু পেরিয়ে ঢাকার গুলিস্তান থেকে পিরোজপুর শহরে প্রথম যাত্রীবাহী পরিবহন এলো। ইমাদ পরিবহনের ঢাকা মেট্টো-ব-১৫-৩৮৫৫ নাম্বারের গাড়িটি গুলিস্থান থেকে ৪৫ জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে এসে পদ্মাসেতু অতিক্রম করে সাড়ে ৪ ঘন্টায় পিরোজপুরের নতুন বাসটার্মিনালে এসে থেমে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। ঢাকাসহ বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক জ্যাম না থাকলে গুলিস্থান থেকে ৪ ঘন্টায় পিরোজপুর আসা সম্ভব হতো বলে জানান গাড়ির চালক আবুল বাসার।
জীবনে এই প্রথম এবং গাড়ী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার প্রথম দিনে এ সেতু অতিক্রমে তার অনুভূতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার এখনও মনে হয় তিনি যেন স্বপ্ন দেখছেন। জীবনের কতশত ঘন্টা পঞ্চাশোর্ধ বয়সের এ চালকের মাওয়া-জাজিরা উভয় প্রান্তে অপেক্ষা ও কষ্টে কেটেছে তার হিসেব নেই।
চালক বাসার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তার দৃঢ়তা, সততা, যোগ্যতা, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্তিম ভালবাসার ফসল হচ্ছে এই স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

ঢাকা থেকে ইমাদ পরিবহনে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে এসে পিরোজপুরের সিও অফিস মোড়ে নামা যাত্রী আলাউদ্দিন সিকদার বলেন, এ সেতুটি হচ্ছে আমাদের সক্ষমতার প্রতীক। বিশ^বাসিকে আমরা জানাতে সক্ষম হয়েছি যে, আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। শহরতলীর শিকারপুরের বৈদ্যবাড়ির মোড়ে নেমে যাওয়া যাত্রী মোশারেফ হোসেন জানান, তিনি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় বৃষ্টির মধ্যে কাঠালবাড়ি ও শিমুলিয়া ফেরীঘাটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জন্য তিনি চিকিৎসা শেষে ঢাকায় গত ১১ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। পদ্মা সেতু গাড়ী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ারর প্রথম দিনই তিনি পদ্মা সেতু পাড় হয়ে পিরোজপুরে এসেছেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ায় যাতাযাতে এখন আর কোন ভোগান্তি নেই। আজ প্রথম দিন লোকজন পদ্মা সেতু দেখতে আসায় সেতুতে কিছুটা জ্যাম ছিল, তবে আগামীতে তাও থাকবে না। তখন মাত্র সাড়ে তিন থেকে ৪ ঘন্টার মধ্যেই পিরোজপুরে আসা বা ঢাকা যাওয়া যাবে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা দক্ষিণাঞ্চালের মানুষ খুবই সৌভাগ্যবান যে বঙ্গবন্ধু কন্যার সুযোগ্য নেতৃত্ব আমরা পাচ্ছি। পদ্মা সেতুর কারণে শুধু যোগাযোগই নয়, চিকিৎসা, ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই পিরোজপুরসহ দক্ষিনাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হবে।
