বিএনপি নেতার জামাতার কান্ড
উদ্বোধনের আগেই ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু দিয়ে বিয়ের গাড়ি বহর পার
পিরোজপুরের কচা নদীর উপর নির্মিত ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর উদ্বোধনের আগেই পার হয়েছে বিয়ের গাড়ি বহর। এ ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র নিন্দার ঝড় উঠে। প্রশ্ন জাগে কে এমন ব্যক্তি যিনি উদ্বোধনের আগেই বীরদর্পে নববিবাহিত বধূকে নিয়ে সেতু পার হয়ে গেলেন। তবে পিরোজপুর কন্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নববধূকে নিয়ে বিয়ের গাড়ি বহর পার হওয়া ব্যক্তি হচ্ছেন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি এসএসএফ এ কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে। তার বাড়ি বরিশালের চরবাড়িয়ার রাজমহলে।
জানা গেছে, বহুল প্রতিক্ষিত এই সেতুর কাজ প্রায় ৯৫ ভাগ শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনে পরে চলতি বছরের যে কোন সময় এ সেতু উদ্বোধন হওয়ার কথা। এ সেতু এই অঞ্চলের মানুষের কাছে বহুল কাঙ্খিত তাই সেতু ঘিরে জনগনের আগ্রহের শেষ নেই। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল- সেতু কর্তৃপক্ষ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার নামে উৎসুক জনগনকে বাঁধা প্রদান করছিলো। এমনকি এ উন্নয়নের নিউজ করতে গেলে সাংবাদিকদেরও না না অযুহাত দেখিয়ে কয়েক দফা বাঁধা প্রদান করে। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা ও সেতু বিভাগের বরিশাল নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুমতিক্রমে সাংবাদিকরা নিউজ করেন। তবে বিশেষ বিশেষ লোকের জন্য ছাড় দেয়ায় ক্ষোভ দানা বাধছিলো জনমনেও। সর্বশেষ বিশাল গাড়িবহর পার করার দৃশ্য স্থানীয় এক তরুন ফেসবুকে আপলোড করলে নিন্দার ঝড় ওঠে। পিরোজপুরের গণ্যমান্য রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি সাধারণ মানুষ, ছাত্রদের মধ্যে নিন্দার ঝড় ওঠে।
জানা গেছে, বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাপ্টেন পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা এর বিয়ের গাড়ি বহরটি বরিশাল থেকে পিরোজপুরের খুমুরিয়া এলাকায় আসে বিয়ে বাড়িতে। পিরোজপুর জেলা বিএনপির সদ্যবিলুপ্ত কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট ফিরোজ খান বাবু’র মেয়েকে বিয়ে করেন উক্ত ক্যাপ্টেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের পরে বিকেলে কনে নিয়ে যাওয়ার সময় পিরোজপুরের কুমিরমারা প্রান্তের ব্রিজের ব্যাড়িকেড পার হয়ে কাউখালীর বেকুটিয়া পয়েন্ট থেকে গাড়ি বহর নিয়ে বেড়িয়ে যান। ফেজবুকে ভাইরাল হওয়া ২ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়িগুলো কঁচা নদীর পিরোজপুর সদর উপজেলার কুমিরমারা প্রান্ত থেকে কাউখালীর বেকুটিয়া প্রান্তে পৌঁছায়। সেখানে ব্যারিকেডের কাছে গাড়িগুলো থামার পর ২/৩ জন লোক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় বরও নেমে এসে ব্রীজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশদের সাথে কথা বলেন (ভিডিও দেখে এটা বলা)। পরে কয়েকজন যুবক ব্যারিকেড সরিয়ে দিলে গাড়িগুলো পার হয়। বিয়ের গাড়ি বহরের দুটি প্রাইভেট কার এবং একটি বাস ব্রীজ পার হয়ে যায়। তবে কুমিরমারা প্রান্ত থেকেও গাড়িগুলো কিভাবে ব্রীজে উঠলো সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ।
একটি সূত্র জানায়, বরযাত্রীদের একজন তার মোবাইল থেকে পিরোজপুর সদর থানার ওসি আ. জা. মো. মাসুদুজ্জামানের সাথে কথা বলেন। পরে তিনি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্যকে ফোনটি ধরিয়ে দেন। এরপরেই ব্যাড়িকেড খুলে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে অস্বীকার করে পিরোজপুর সদর থানার ওসি বলেন, তার সাথে রবযাত্রী কারও সাথে কোন কথা হয় নি।
জানতে চাইলে সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক সেতু বিভাগের বরিশাল নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন জানান, চীনের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এখনো সেতুটি হস্তান্তর করেনি। তাই সেতুর নিরাপত্তার বিষয়টি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করবে যে উদ্বোধনের আগে কেউ সেতু ব্যবহার করতে পারে কি না। তবে বিষয়টি নিয়ে পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে কথা হয়েছে। তিনি একটি চিঠি দিতে বলেছেন। ব্রীজে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হবে।
পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে সেতু ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সেতুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, স্থানীয়রা বলছেন- শুধু এই গাড়ি বহরই নয় বিশেষ উপায়ে প্রায়শই মোটর সাইকেল জীপ গাড়ি চলাচল করার অনুমতি মেলে। শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্যই অনেক বেশী নিয়ম কানুন এখানে। এ ব্যাপারে ইউটুবার সোহাগ খান বলেন, এ সেতু নিয়ে ভিডিও চিত্র ধারণ করতে গিয়ে নানা রকম বাঁধার সম্মুখীন হয়েছি। তখনও দেখেছি মিডিয়ার গাড়ি এমনকি সংবাদ কর্মীদেরও পায়ে হেটে নিউজ করতে বাঁধা দেয়া হয়েছে। জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম ডালিম এ ভিডিও শেয়ার করে বলেন, এরা কত বড় ক্ষমতাবান এরা কারা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। তাহলে কি এভাবেই শুভ উদ্বোধন হলো এ সেতু।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারী কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পিরোজপুরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের এ সেতুটি উদ্বোধন করবেন, সেখানে উদ্বোধনের আগেই একটি সুসংগঠিত বাহিনীর কর্মকর্তা কিভাবে তার নববধূকে নিয়ে গাড়িবহরসহ ব্রীজ পার হন?
পিরোজপুর জেলা মৎস্যজীবী লীগের আহবায়ক শিকদার চাঁন বলেন, এ ধরনের বেআইনী পারাপারের সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইফুল ইসলাম বলেন, ঈদের ছুটিতে ঘুরতে গেছিলাম তখনই দেখছিলাম নিয়ম কানুন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য। কিছু লোক অনায়াসে বাইক নিয়ে, গাড়ি নিয়ে সেতু পার হয়।
পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি ঠিক হয়নি। উদ্বোধনের আগে বিয়ের গাড়ি বহর কিভাবে অতিক্রম হলো বুঝতে পারছি না। এ বিষয়ে সেতু বিভাগের বরিশাল নির্বাহী প্রকৌশলীকে কঠোর হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
