পিরোজপুর পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএম’র প্রথম ব্যবহারে সকলের সন্তুষ্টি
ইভিএম পদ্ধতিতে পিরোজপুর পৌরবাসী ভোট প্রয়োগে এক নতুন অভিজ্ঞতায় স্বাদ নিলেন। শনিবার অনুষ্ঠিত পৌরসভার ৮ জন সাধারণ কাউন্সিলর এবং ৩ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচনে এই আধুনিক ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট দিয়েছেন পৌরবাসী। যদিও ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে সংসদ ও সিটি কর্পোরেশনের ভোটে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে পরীক্ষামূলক ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পিরোজপুরে এরআগে কোন নির্বাচনেই ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহৃত না হওয়ায় পৌরসভার ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে ছিল ব্যাপক আগ্রহ, উৎসাহ, উৎকন্ঠা। কারণ এই পৌর শহরের ১৮টি কেন্দ্রের অধিকাংশই ছিলো শহরতলীর ভোটার। যাদের মধ্যে মহিলা, বৃদ্ধ, অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ভোটার ছিলেন অনেক। এক দুইদিনের সীমিত মাত্রার প্রশিক্ষণ নিয়ে এই মেশিনে ভোট দেয়া ছিলো ভোটারদের কাছে এক ধরণের চ্যালেঞ্জ। তারপরও শনিবার পৌর নির্বাচনের ভোট কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে মানুষ এ আধুনিক যান্ত্রিক ভোট দানে উৎরে গেছেন, সফল হয়েছেন। সকালে এই প্রতিবেদক নিজে ভোট দেন শহরের সবচেয়ে সচেতন ওয়ার্ড ৭ নম্বরের কিয়ামউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। নিজে ভোট দিতে গিয়ে এবং সকাল বেলার শীতের আমেজে ভোট দিতে আসা এ কেন্দ্রের হাতেগোনা ভোটাররা ইভিএম পদ্ধতিকে খুব আগ্রহের সাথে লুফে নিয়ে ভোট দিয়ে যেন উল্লুসিত।

এ কেন্দ্রে দেখা হয় ভোটার সিনিয়র সাংবাদিক ও প্রেসক্লাব সভাপতি মুনিরুজ্জামান নাসিম আলীর সাথে। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বললেন, ভালোইতো, ভোটাররা একটু চালাক হলেই সহজে কাজটি কম সময়ে সম্পন্ন করতে সক্ষম। এরপর একই ওয়ার্ডের আফতাব উদ্দিন কলেজ কেন্দ্রে দেখা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ সমাজ কর্মী এম এ রব্বানী ফিরোজের সাথে। তিনিও একই অভিমত জানালেন। ১০টা দিকে ৩নং ওয়ার্ডের বড় খলিশাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে অনেকটা অবাক হতে হলো। প্রায় গ্রামের এই কেন্দ্রের পুরুষ ও মহিলা ভোটরার যেন উপচে পড়েছেন। লাইন ধরে শত শত ভোটার ভোট দানের জন্য অপেক্ষা করছেন।

বুথের মধ্যে ঢুকে দেখা গেলো তখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ ছাড়াই ইভিএমএ পর্যায়ক্রমে ভোট চলছে। এরপর সাড়ে ১০টায় ৮নং ওয়ার্ডের হুলারহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে একই রকমের ভোটারদের ভীড়। এখানে একজন ভোটার আব্দুর রহমান তার হাতের আঙ্গুলের ছাপ ইভিএম মেশিন গ্রহণ না করায় তিনি ভোট দিতে পারছেন না। এখানকার প্রিজাইডিং অফিসার আফতাব উদ্দিন কলেজের প্রভাষক গাজী এনায়েত হোসেন চেষ্টা করছেন এ ভোটারের ভোট দান নিশ্চিত কিভাবে করা যায় তা সমাধানের। প্রত্যেকটি কেন্দ্রে একজন করে টেকনিশিয়ান রয়েছেন নির্বাচন কমিশনের। এ কেন্দ্রের টেকনিশিয়ান হচ্ছেন পটুয়াখালী উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে আসা মো. কোরবান। তিনি বললেন, বিষয়টি কমিশনের সার্ভার স্টেশনের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। যার ফলাফল বিকেল তিনটার মধ্যে আসবে এবং সংশ্লিষ্ট ভোটার ভোট দিতে পারবেন।

এ কেন্দ্রে দেখা হলো প্রবীণ ভোটার শেখ আব্দুল মান্নানের সাথে। তিনি বলেন, ভোট কেন্দ্রে আসার আগে এই নতুন কলের বাক্সে কি করে ভোট দিবো তা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ভয়ে ছিলাম যদি ভোট দিতে না পারি। কিন্তু দেখলাম সবই পানির মত সোজা। এ ভোট যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট দিলে ফলাফল উল্টানো যায় কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে এই বৃদ্ধ বললেন, প্রশ্নেই আসে না। ৩নং ওয়ার্ডের হুলারহাট দারুশ শরিয়াত দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা হলো অনন্ত কুমার সিকদার নামে নবতিপর বৃদ্ধ এক ভোটারের সাথে। চলাফেরায় অক্ষম এই বৃদ্ধ তার নাতির কোলে চড়ে ভোট দিতে এসে নাতির সহযোগিতায় ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিয়েছেন। নাতি বললো, ঠাকুরদার পছন্দমত প্রার্থীকে ইভিএম’র বাটনে চাপ দিয়ে সে ভোট দেয়ার কাজটি সম্পন্ন করেছেন। এ কেন্দ্রে মো. ইসমাইল খানসহ ৫ জনের আঙ্গুলের ছাপ এবং তথ্যগত সমস্যার কারণে ১০.৪৫ মিনিটে তাদের ভোট দান স্থগিত রাখা হয়।

প্রিজাইডিং অফিসার জানালেন, সার্ভার স্টেশনে যোগাযোগ করে সমাধান করা হবে এবং বিকেলে তারা ভোট দিতে পারবেন। এ কেন্দ্রে পৌর নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসার খান আবি শাহনুর খান অনেকটা ক্ষুব্ধকন্ঠে ভোটারদের লাইনে দাড়ানোর বিশৃঙ্খলা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভৎসনা করছিলেন। এ অবস্থায় তার কাছে জানতে চাওয়া হয় ইভিএম নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া কি। তিনি বললেন, এ জেলায় এই প্রথম ইভিএম পদ্ধতির ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ পর্যায়ে ইভিএম নিয়ে তার অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রয়োগ ও ব্যবহার পর্যায়ে এই প্রথম। তিনি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট ও আশাবাদী।

এ কেন্দ্রে দেখা হলো পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খানের সাথে। কেন্দ্র এলাকাটি অতীতকাল থেকে অপরাধ প্রবণ হওয়ায় এবং একটি নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময় খুন-জখম-হাঙ্গামা-দুর্বৃত্তায়ান ইত্যাদি প্রেক্ষিতে আজকের ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বললেন, সব ধরণের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রস্তুত। রায়েকাঠি পুলিশ লাইনস কেন্দ্রটি পৌর নির্বাচনের নৈরাশ্যজনক অভিজ্ঞতার। ১১.২০ মিনিটে এ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেলো ৯৭৭ জন ভোটারের মধ্যে ১০২ জনের উপস্থিতি অর্থাৎ শতকরা ১০.৪৪ জন। এখানে কথা হয় সুফিয়া বেগম নামে এক বৃদ্ধার সাথে। তিনি বললেন, কলের ভোট যন্ত্রে তিনি সহজেই ভোট দিতে পেরেছেন। বিকেল ৪টায় জানা গেলো এ সংখ্যা সর্বশেষ ৩৩৭ ও শতকরা ৩৪.৪৯ জন। প্রিজাইডিং অফিসার ও সমাজ সেবা বিভাগের প্রভেশনার অফিসার মো. জাকির হোসেন জানালেন, এ কেন্দ্রে শুধু নারী আসনের কাউন্সিলর প্রার্থীর নির্বাচন চলছে। মেয়র পদ ও এ ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগেই নির্বাচন হয়ে গেছে। যে কারণে এই ভোটারদের উপস্থিতিতে দুরাবস্থা। জাকির জানালেন, ভোট গ্রহণ শেষে অন্য কেন্দ্রের আগেই চূড়ান্ত প্রিন্ট দিয়ে ফলাফল পাওয়া যাবে। কেন্দ্রে দেখা হলো ভিজিলেন্স টিমের প্রধান সমাজসেবা বিভাগের উপ-পরিচালক আক্তারুজ্জামান তালুকদারের সাথে। বিকেল ২.৩০ মিনিটে আলামকাঠি পল্লী মঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে দেখা গেলো নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। সকালেও এখানে এমন ভীড় ছিলো বলে জানালেন এখানকার ভোটার ও এক প্রার্থীর সক্রিয় সমর্থক তরুণ ব্যবসায়ী সামসুল আলম লিটু সাথে। তিনি জানালেন, ইভিএম পদ্ধতি বেশ চমৎকার। পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ কেন্দ্রের ভোটার পিরোজপুর প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক ফসিউল ইসলাম বাচ্চু জানালেন, ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক যে অপপ্রচার ছিলো পিরোজপুর পৌরসভা নির্বাচনে তার সফল ব্যবহারে সব ধরণের উৎকন্ঠার অবসান ঘটলো।
