জাতীয়ভাবে সুন্দরবন দিবস পালনে আর কত অপেক্ষা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি ও বিশ্ব ঐহিত্যের অংশ সুন্দরবন। সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি। বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের অন্যতম। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপুরুপ নোনাজলের বনভূমি। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। যা যৌথভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবস্থিত। সুন্দরবনের বাংলাদেশের অংশের আয়তন ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার অংশে অবস্থিত। আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিন ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অংশ নিয়ে সুন্দরবন গঠিত।
১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে ঘোষনা করে। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবনে ঘুরতে আসে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক সুন্দরনের অপুরুপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। সুন্দবন শুধু পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, বিশ্বে সুন্দরবনের মতো এত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আর কোন বনে নেই। এই জন্য সুন্দরবনকে জীববৈচিত্র্যের জীবন্ত পাঠশালা বলা হয়। প্রানী ও বৃক্ষের বৈচিত্র্যের সমাহার এই বন বৈজ্ঞানিক, নৃতত্ব ও প্রতœতাত্বিক বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৪ ফেব্রুয়ারী সুন্দরবন দিবস। এবার ২০তম সুন্দরবন দিবস। সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষনে জনসচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে সুন্দরবন দিবস পালন করা হয়। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার সেচ্ছাসেবী সংগঠন রুপন্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশ গ্রহনে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারীকে সুন্দরবন দিবস ঘোষনা করা হয়।
২০০২ সাল থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জেলাগুলোতে সুন্দরবন দিবস পালন করা হয়। তবে গত ২০ বছরেও জাতীয় ভাবে দিবসটি পালনে সাড়া মেলেনি। প্রথম থেকেই আয়োজকরা সরকারের কাছে জাতীয় ভাবে সুন্দরবন দিবস পালনের দাবি জানিয়ে আসছে। সরকার সুন্দরবন সুরক্ষায় আন্তরিক হলেও এতো দিনে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোন সাড়া মেলেনি। সুন্দরবন সুরক্ষা করতে সরকার নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পর্যটকদের সুন্দবন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ও সুন্দরবন ভ্রমণে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে খুলনায় ২০০১ সালে খুলনায় তথ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র খোলা হয়। জাতীয় ভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করা হলে আর্ন্তজাতিক পর্যায়েও সুন্দরবনের গুরুত্ব তুলে ধরা সহজ হবে। সুন্দরবন বিভাগ কয়েক বছর ধরে বন সংলগ্ন জেলাগুলোতে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যৌথ ভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করছে। যতবেশী মানুষকে যুক্ত করা যাবে সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় ততো বেশি সহয়ক হবে। সুন্দরবন সুরক্ষায় জাতীয় ভাবে সুন্দরবন দিবস পালনের কোন বিকল্প নেই।
সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য। প্রকৃতির স্বর্গ, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এই সুন্দরবন। সুন্দরবন বাংলার গর্ব, বিশ্বের গৌরব। জগৎসেরা ও জীববৈচিত্র্যের আঁধার এই বন বাঙালী জাতির গর্ব। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এই বনে। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এই সুন্দরবন। এখানে রয়েছে প্রায় ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিত, ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর, ৯ প্রজাতির শামুকসহ কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন সহ নানা প্রজাতির মাছ। তাছাড়া জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ৪৫০টি ছোট-বড় খাল ও নদী।
উপকুল আঞ্চলে মানুষের জীবন প্রবাহের সাথে সুন্দরবন আবর্তিত। আবহমান কাল সুন্দরবনের সাথে মানুষের নিবীড় ঘনিষ্ঠতা। এই অর্থে সুন্দরবনের ভাল-মন্দ এ অঞ্চলের মানুষকে নাড়া দেয়। সুন্দরবন প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন, ঝূর্ণিঘড়, জলচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপথকে আগলে রেখেছে ও রক্ষা করছে প্রাকৃতিক ভারসম্য। ১৯৮৮ সালের ঘুর্ণি ঝড়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর, ২০০৮ সালের ২৫ মে আইলা ও সর্বশেষ বুলবুলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবন মায়ের মত উপকুলবাসীকে আগলে রেখেছে। এ কথা সত্য যে, সুন্দরবন যদি না থাকতো তাহলে সিডরের প্রচন্ডতায় উপকূলীয় অঞ্চল প্রাণহীন এক বিরান ভূমিতে পরিণত হতো। সুন্দরবন এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থে সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সুন্দরবন দিবসে আলোচনায় অতিথিবৃন্দ, বিশেজ্ঞরা ও সুন্দরবন প্রেমীদের জোরালো দাবি রাষ্ট্রীয়ভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করা হোক। এ কোন আবেগ নয়, বাস্তবতায় অত্যন্ত যৌক্তিক।
বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ এবং মোট বনাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ জুড়ে থাকা এ বনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মূল্যবান প্রানীজ, জলজ ও বনজ সম্পদ মিলে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের আঁধার। এই সুন্দরবন শুধু জীব বৈচিত্রের উৎস নয়, একই সাথে বন সংলগ্ন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকার উৎস হিসাবে অবদান রাখছে। কাঠ, মধু, মৎস, অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরনের মাধ্যমে ৫-৬ লাখ মানুষ প্রায় সারা বছর জীবিকার জন্য সরাসরি সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষনে বন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেই চলেছে। তাই এই বনের জীববৈচিত্রকে সংরক্ষনের জন্য এখনই প্রয়োজন সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। তাহলে প্রকৃতি প্রেমীদের পদচারনায় মুখরিত হবে সুন্দরবন। বিকশিত হবে পরিবেশ বান্ধব পর্যটন শিল্প। ফলে একদিকে যেমন সুন্দরবন বিশ্বসেরা সম্পদ হিসাবে পরিচিতি হবে, তেমনি এ বনের সুরক্ষার কাজ হবে শক্তিশালী। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগমন বাড়বে ও দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। উপকূলের অবহেলিত জনপদে প্রাণচাঞ্চল্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পাবে। তাই সরকারিভাবে সুন্দরবন দিবস পালিত হলে সুন্দরবনের গুরুত্ব আরো বাড়বে। আর সেই সাথে সুন্দরবন সু-রক্ষায় সকলে সচেতন হবে।
লেখক: সাংবাদিক।
