প্রধান সূচি

পিরোজপুরে সংকুচিত হয়ে গেছে সামাজিক বিনোদন মাধ্যম || প্রভাব পড়ছে নতুন প্রজন্মের ব্যক্তি আচরণে

জেলা শহরসহ পিরোজপুরের শহর-বন্দর-গ্রামে সংকুচিত হয়ে গেছে বিনোদন উপভোগের সামাজিক মাধ্যমগুলো। মোবাইল ফোন, টিভি, ইন্টারনেট, ভিডিও গেমস ইত্যাদি ব্যক্তি কেন্দ্রিক যন্ত্র নির্ভর বিনোদন মাধ্যম নির্ভর হয়ে পড়ায় মানুষের সামাজিক বৈশিষ্ট্যে দেখা দিয়েছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। যে কারণে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি আর আবহমান কালের আচার-আচরণ।

জারী-সারি, যাত্রা, সার্কাস, পালাগান, মঞ্চ নাটক ইত্যাদি ছিলো পিরোজপুর জেলার শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বিনোদন বাহন। দলবেঁধে সিনেমা, বায়োস্কোপ, পুতুল নাচ দেখতে যাওয়ার দৃশ্যও এখন আর চোখে পড়ে না। লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ, ঘোড়দৌড়, বৈশাখী মেলা, নীলের মেলা ইত্যাদি পার্বনিক লোকজ অনুষ্ঠানাদি বছরের বিভিন্ন সময় মানুষের বিনোদন চাহিদা মিটাতো। দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, হাডুডু, ডাংগুলি, ছি-বুড়ি নানা ধরণের খেলায় মত্ত থাকতো গ্রাম-পাড়া-মহল্লার কিশোর-কিশোরীদের দল।

বিনোদনের এসব অনুষঙ্গের অনুপস্থিতির কারণে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সৃষ্ট মাত্রাগত পরিবর্তনের ধকলে মানুষের আচার-আচরণ বদলে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সমাজ জীবনের সকল স্তরে। এ ব্যাপারে দেশের খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শংকর সাওজাল বলেন, পিরোজপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে এক সময় সক্রিয় ছিলাম গভীরভাবে। এখানকার বর্তমান সংকটের সাথে সারা দেশের তথা বিশে^র সাযুজ্য বিদ্যমান। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য। যা আজও অর্জিত হয়নি। এই দৈন্যদশায় আক্রান্ত পিরোজপুরসহ সারা দেশের সংস্কৃতি।

পিরোজপুরের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক সালেহ উদ্দিন সেলিম এই পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ক্ষতিকর দিকের কথা উল্লেখ করে বলেন, ঐতিহ্যবাহী বিনোদন মাধ্যমগুলো অপাংক্তেয় হয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম ক্রমাš¦য়ে বিগড়ে যাচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সাবেক ক্রীড়া সংগঠক এ প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আরো বলেন, যন্ত্র নির্ভর বিনোদন মাধ্যমে আজকের ছেলে-মেয়েদের আমরা যেন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। খেলার মাঠও শিশু-কিশোরদের আগের মত টানে না। মঞ্চ নাটক না থাকায় তৈরী হয় না শিল্পী-কুশীলব। এ অবস্থার জন্য তিনি আধুনিকতা ও যান্ত্রিক বির্বতনের নামে তথা কথিত বিকাশকে দায়ী করে আরও বলেন, নতুনদের অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে সামাজিক বিনোদনের পুনর্জ্জীবনের কোন বিকল্প নেই।

দিশারী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সামশুদ্দোহা মিলন বলেন, এ মফস্বল শহরে তিন যুগ ধরে আমরা শিল্প-সংস্কৃতি চর্চ্চা করি। বর্তমান প্রজন্মকে দলবদ্ধ বিনোদনে ধরে রাখা দুস্কর। তথ্যপ্রযুক্তির সুফলকে কাজে লাগিয়ে নেতিবাচক দিক বর্জনের মাধ্যমে নতুনদের রক্ষা করতে হবে।

সাংস্কৃতিক বিকাশে আজীবন ডুবে থাকা জেলা শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম রেজাউল করিম অনেকটা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এখনও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই অবক্ষয়ের কবল থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে। প্রতিযোগিতা উপযোগী করতে ব্যক্তি উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ছবি আঁকা, কবিতা আবৃত্তি, একক অভিনয়ে কিছু সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। কদাচিৎ শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে মঞ্চ নাটক, যাত্রা ইত্যাদি সামাজিক বিনোদনের আয়োজন হয় বটে কিন্তু নাট্যদল গুলো এখন আর আদৌ সংগঠিত ও সক্রিয় নয়। দু’টি মেধাবী কন্যা সন্তানের বাবা জগৎ প্রিয় দাস বিশু বলেন, সুস্থ বিনোদনের অভাবে শিশুদের মানোবিকাশ বেশী বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে শিশু-অভিভাবকদের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুর ফেইসবুক একাউন্ট রয়েছে। এছাড়া ৩৭ শতাংশ শিশু স্মার্টফোন ব্যবহার করে এবং ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর পার করার আগেই ডিজিটাল বিশে^ প্রবেশ করে। যা সার্বিক বিবেচনায় শিশু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে করে ভবিষ্যৎ সামাজিক কাঠামো ব্যবস্থায় এক ধরণের ফাঁক সৃষ্টি হচ্ছে, সামাজিক বন্ধন ক্রমশঃ আলগা হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এ কারণে শিশু বিনোদন থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial