পরিবার পরিকল্পনা সেবার অনন্য উদাহরণ
পিরোজপুরের পাড়েরহাট ও পত্তাশী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র
পরিবার পরিকল্পনা সেবায় অনন্য উদাহরণ হতে পারে উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার পারেরহাট এবং পত্তাশী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র। ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের সংযোগ সড়ক নির্মান করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা মান বাড়ানোর জন্য পত্তাশী ইউনিয়নের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটি অপরেশন থিয়েটার নির্মান করা হয়েছে। ফলে এই এলাকার গর্ভবতী মায়েরা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে এবং ঝুঁকিমুক্তভাবে সন্তান প্রসব করতে পারছেন এবং পছন্দমতো পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহন করতে পারছে।
সরোজমিনে দেখা য়ায়, ইন্দরকানী উপজেলার পাড়েরহাটের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্রের ভবন থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত একটি আরসিসি সড়ক নির্মান করা হয়েছে, যার ফলে সহজে সকল সেবা গ্রহীতা এখানে আসতে পারছে।
ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পরিমল চন্দ্র মিত্র জানান, এই সংযোগ সড়কটি না থাকায় আগে রোগীদের এই সেবা কেন্দ্র আসতে অনেক কষ্ট হতো। বিশেষ করে প্রসূতি এবং গর্ভবতি মায়েদের এখানে আসতে অনেক সমস্যা পোহাতে হতো। এখন খুব সহজেই ভ্যানে বা গাড়িতে চড়ে সরাসরি এই সেবা কেন্দ্রে তারা আসতে পারছে রোগীরা। এখন এ সেবা কেন্দ্র প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন।
পাড়েরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. গোলাম সরোয়ার বাবুল বলেন, গর্ভবতি, প্রসূতি এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহীতা কোন নারীর যেন কোন দুর্ভোগে পড়তে না হয় সেজন্য লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রোজেক্টের (এলজিএসপি) আওতায় পাড়েরহাট ইউনিয়ন পরিষদের উদ্য্যেগে ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে উক্ত সংযোগ সড়কটি নির্মান করা হয়েছে। যার সেবা এখন স্থানীয় সেবা গ্রহীতারা পাচ্ছেন। এ সময় চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের এই সেবা কেন্দ্র একজন ভারপ্রাপ্ত এফডাব্লিউভি আছেন তিনি অতিরিক্তি দায়িত্ব হিসেবে এই কেন্দ্র সেবা প্রদান করে থাকেন। এখানে একজন এফডাব্লিউভি এর পোস্টিং দিলে আমাদের এই সেবা কেন্দ্রের মান আরো বাড়বে বলে আশা করছি।
ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা রুমি আক্তার জানান, এ ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন মায়েদের পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদ সবসময় সচেষ্ট রয়েছেন। এখানে রয়েছে পোস্ট ডেলিভারী রুম, যেখানে পরিবার পরিকল্পনা কাউন্সিলিং করা হয়ে থাকে। প্রতিমাসে এ স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে ২০/২৫ জন গর্ভবতী মা এসে তাদের সন্তান জন্মদান করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রসব পরবর্তি পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, আমি এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি, এখানে একজন নিয়মিত এফডাব্লিউভি পোস্টিং দিলে পাড়েরহাট ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্রটি প্রত্যন্ত এ অঞ্চলের মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে পারবে।
একই উপজেলার পত্তাশী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এই কেন্দ্রে একটি পরিপাটি অপরেশন থিয়েটার এবং একটি কাউন্সিলিং রুম রয়েছে। এখানে নিয়মিত বিভিন্ন সেবা বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের নিয়মিত কাউন্সিলিং দেওয়া হচ্ছে।
পত্তাশী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার রবীন্দ্র নাথ দাস জানান, এই সেবা কেন্দ্রটি পরিচলনার জন্য ১৬ সদস্যের একটি এফডাব্লিউসি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। উক্ত কমিটির সভাপতি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। প্রতি দুই মাস অন্তর এই ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং হয়। এই সেবা কেন্দ্রের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য এই ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রয়োজনে স্থানীয় সিভিল সোসাইটির সাথে সভা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। এর অংশ হিসেবে গত অর্থ বছরে ইউনিয়ন পরিষদ তাদের তহবিল থেকে এই সেবা কেন্দ্রের সামনের রাস্তা মেরামত করেছেন। চলতি বছর লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রোজেক্টের (এলজিএসপি) থেকে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা দিয়ে বেসরকারী সংস্থা সুশীলণের পরামর্শক্রমে এবং মোরীস্টোপ বাংলাদেশের টেকনিক্যাল সহযোগিতায় এখানে একটি অপরেশন থিয়েটার নির্মান করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কাউন্সিলিং রুম যেখানে পরিবার পরিকল্পনা কাউন্সিলিং করা হয়ে থাকে। প্রতিমাসে এ স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে ২০/২৫ জন গর্ভবতী মা এ কেন্দ্রে এসে তাদের সন্তান জন্মদান করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিয়ে থাকেন বলে জানান।
পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা পারভিন আক্তার জানান, কাউন্সিল কর্নারের মাধ্যমে এখানে কিশোর কিশারীদেরকে প্রজন্ম স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পরামর্শ প্রদান করা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, প্রত্তাশী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্রটি প্রত্যন্ত এ অঞ্চলের মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক জেলা ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা এম এ রব্বানী ফিরোজ জানান, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকারের কোন বিকল্প নেই। ইউনিয়ন পরিষদ এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে সক্ষম যার উদাহরণ পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট ও পত্তাশী ইউনিয়ন। সরকার, এনজিও এবং স্থানীয় সরকারে কার্যকরী অংশগ্রহণ এই সাফল্য এনে দিয়েছে যা একটি অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদ এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে আরো গতিময় আর কার্যকরী করে তুলবে যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহনের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।
পরিবার পরিকল্পনা সেবা বাস্তবায়ন কাজের সাথে যুক্ত বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের প্রোগ্রাম অফিসার মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মেরিস্টোপ বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে স্থানীয় সরকারের কার্যকর অংশগ্রহনের জন্য ২০১৮ সাল থেকে পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কাজ করছে। তারই অংশ হিসেবে পাড়েরহাট ও পত্তাশী ইউনিয়নের গর্ভবর্তী মায়েদের সুরক্ষায় ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান উন্নয়নে কাজ করে আসছে। প্রায় এক বছর পিরোজপুরে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্য সেবা একটি মডেল। ইউনিয়ন পরিষদ তাদের এই সাফল্যের জন্য সুশীলন ও মেরীস্টোপস বাংলাদেশ এর ভূমিকাকে প্রশংসা করেন এবং ইউনিয়নের পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উন্নয়নে ইউনিয়ন পরিষদের ভুমিকা আরো জোরদার করার জন্য সুপারিশ করেন।
