প্রধান সূচি

শিল্পকলা একাডেমির গুনীজন সম্মাননা পদক পেলেন কাউখালীর সুব্রত রায়

পিরোজপুরে শিল্পকলা একাডেমির গুনীজন সম্মাননা পদক পেলেন কাউখালীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিজন সুব্রত রায়। পিরোজপুরে লোক সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখায় সুব্রত রায় ২০১৬ সালের এ পদকে ভূষিত হন। গত মঙ্গলবার বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটরিয়ামে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে শিল্পকলার বিভিন্ন শাখায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ গুনীজন সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়। ৫টি ক্যাটাগরিতে প্রতি বছর পাঁচ জন করে এবারে পিরোজপুরের মোট দশজন গুনী শিল্পীকে জেলা শিল্পকলা একাডেমী গুনীজন সম্মাননা প্রদক দেওয়া হয়েছে। পদকপ্রপ্তদেরকে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সনদ, পদক ও দশ হাজার টাকা করে সম্মানী প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মোঃ জিয়াউল আহসান গাজী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক আবু আলী মোঃ সাজ্জাদ হোসেন এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মোঃ সালাম কবির। অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৈৗশলী সুশান্ত রঞ্জন রায়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট নাহিদ ফারজানা ছিদ্দিকী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ঝুমুর বালা, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসিফ মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও জেলা উদীচীর সভাপতি এডভোকেট এম.এ মান্নান, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক গৌতম নারায়ন রায় চৌধুরী, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা নকীব, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস.এম জিয়াউল হক ও জেলা কালচারাল অফিসার জান্নাতুল ফেরদৌস প্রমূখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, পিরোজপুরের মত প্রত্যন্ত জেলায় গুনীজনদের সম্মাননা প্রদান ও তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে হাজারো গুনীজনের সৃষ্টি হবে। পিরোজপুরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় তিনি কাজ করে যাবেন বলেও আশস্ত করেন।

প্রদকপ্রাপ্ত গুনীজনদের মধ্যে সুব্রত রায় তাঁর অনুভূতি ব্যাক্ত করতে গিয়ে বলেন, এ সম্মান আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে পাওয়া এ স্বীকৃতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বলে তিনি মনে করেন। এর মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত দেশীয় সংস্কৃতি আরও উৎসাহিত হবে।

লোক সংস্কৃতিতে সুব্রত রায় সহ ২০১৬ সনে পদকপ্রাপ্ত অন্যান্য গুনী শিল্পীরা হলেন- সংগীতে মোঃ এজাজ হোসেন খান, ফটোগ্রাফীতে চন্দ্রকান্ত দেবনাথ, যন্ত্রসংগীতে রতন কুমার হালদার (সদ্য প্রয়াত), নাট্যকলায় জালাল আহম্মেদ এবং ২০১৭ সালে সৃজনশীল সংগঠক মিনারা বেগম, লোক সংস্কৃতিতে রীনা দাস, যন্ত্র সংগীতে মুন্না দাস, সংগীতে পংকজ কর্মকার ও আলোচিত্রে পলাশ চন্দ্র সাহা।

সংস্কৃতিজন সুব্রত রায় ১৯৬৭ সালে পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার গন্ধর্ব গ্রামে এক মধ্যবিত্ত শিক্ষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরলোকগত পিতা সুভাষ চন্দ্র রায় ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। মাতা মুকুল রানী মিস্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। সুব্রত রায় নিজেও একজন শিক্ষক, তিনি কাউখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন। ১৯৮৪ সালে তিনি স্বরূপকাঠী উপজেলার ইএসপি ইনষ্টিটিউশন, বাটনাতলা থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি স্বরূপকাঠী কলেজ থেকে এইচএসসি ও ১৯৮৯ সালে কাউখালী মহাবিদ্যালয় হতে ডিগ্রী পাস করেন। এরপর তিনি উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৯২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ পাস করেন। পাশাপাশি তিনি ১৯৯৫ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড ডিগ্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএল.বি ডিগ্রী অর্জন করেন। ২০০৬ সালে পেশাগত ক্ষেত্রে তিনি সি-ইন-এড প্রশিক্ষণও লাভ করেন।

ছেলেবেলা থেকেই সংগীতের সাথে ছিল তার সখ্যতা। মায়ের কাছেই সংগীতে হাতেখড়ি। মায়ের কাছ থেকেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে প্রথম গান শেখা। সংগীতে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে তালিম নেন সংগীত শিক্ষক অরুন কর্মকার ওরেফ সেন্টু কর্মকারের কাছে। এরপর তিনি সংগীত শিক্ষক কৃষ্ণকান্ত মন্ডল, পবিত্র সাহা ও পতিত পাবন নট্ট এর কাছে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি বিশিষ্ট সঙ্গীতঙ্গ কলিম শরাফীর কাছেও তালিম নেন। এসময় তিনি প্রথিতযশা সংগীত শিল্পী অজিত রায় এর সান্নিধ্য পেয়েছেন। শিক্ষা জীবনে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জনসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। পেশায় একজন শিক্ষক হয়েও পাশাপাশি তিনি সংগীত চর্চা অব্যহত রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারের রবীন্দ্র সংগীতের একজন নিয়মিত শিল্পী। জেলা শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ২০০৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য জেলার প্রতিশ্রুতিশীল সংগীত শিল্পী নির্বাচনে তিনি রবীন্দ্র সংগীতে প্রথমস্থান অধিকার করেন। তার পেশাগত পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কারিকুলামে সংগীত বিষয়ের নির্ধারিত ১৩টি গান নিয়ে তার একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে। যা দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংগীত বিষয়ের শিক্ষা সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক সারাদেশের ২০০জন প্রতিশ্রুতিশীল সংগীত শিল্পীদের সমন্বয়ে প্রকাশিত অ্যালবামে তিনি রবীন্দ্র সংগীতে কন্ঠ দিয়েছেন। একাধারে তিনি সংগীত শিল্পী, পাশপাশি একজন নাট্যকর্মীও বটে। তবলায়ও তার যথেষ্ট দখল রয়েছে। সংগীত চর্চার পাশাপাশি তিনি একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শিশু সংগঠক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বর্তমানে জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কাউখালী উত্তরায়ন খেলাঘর আসরের দু’দুবার সাধারণ সম্পাদক ও একবার সভাপতি ছিলেন। তিনি কাউখালী উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীরও দু’বার সাধারণ সম্পাদক এবং জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি কাউখালী উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ২০০৯ সনে তিনি গুণীজন সম্মাননা হিসেবে সাপ্তাহিক বলেশ্বর পদকে ভূষিত হন।

তিনি ১৯৯৩ সালে কাউখালীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরেশ চন্দ্র সাহার কনিষ্ঠ কন্যা বীথিকা সাহার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রীও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক। তিনিও একজন সংগীত শিল্পী। তার মেয়ে দীপান্বিতা রায় প্রজ্ঞা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হোম ইকোনমিক্স ইউনিটের চাইন্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে অর্নাস নিয়ে পড়াশুনা করছে। সেও গান করে। তার ছেলে প্রাচুর্য রায় প্রথম শ্রেনিতে অধ্যয়নরত। সংগীতগুণী সুব্রত রায় শুদ্ধ রবীন্দ্র সংগীত চর্চার প্রসারে কাজ করে আসছেন। সম্প্রতি স্বরবিতান সংগীত একাডেমি নামে কাউখালীতে তিনি একটি গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি কাউখালী উপজেলা স্কাউটস এর কমিশনারসহ শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের সাথে জড়িয়ে আছেন।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial