নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
এখানে অপারেশন হয় না, ক্লিনিকে যান করে দিব!
২৪ জুলাই মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকে কথা হয় উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রাম থেকে মেয়ের চিকিৎসার জন্য আসা কাজল বেগমের সাথে। এ সময় তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক প্রীতীশ বিশ^াস তার পূর্ব পরিচিত। সেই সুবাদে মেয়ে তানজিলার পেটে ব্যাথার চিকিৎসার জন্য তার কাছে এসেছিলাম। এখন অপারেশনের জন্য পাশেই নাজিরপুর সার্জিক্যাল ক্লিনিকে যাচ্ছি।
ক্লিনিকে কেন যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ডা. প্রীতীশ বিশ^াস, তানজিলাকে দেখেছেন এবং বাহিরের প্যাথলজি থেকে পরীক্ষাও করিয়েছেন। পরে রির্পোট দেখে তিনি জানিয়েছেন, ‘তানজিলার এপেনডিক্স অপারেশন করাতে হবে কিন্তু এ হাসপাতালে অপারেশন হয় না। পাশেই নাজিরপুর সার্জিক্যাল ক্লিনিক, রোগী নিয়ে সেখানে চলে যান, আমি বলে দিচ্ছি। তারা ভর্তি করে নিবে। আমিই ২ টার দিকে অপারেশন করে দিব।’ পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দিন বিকেল ৪টায় ওই ক্লিনিকে তানজিলার অপারেশন করেছেন ডাঃ প্রীতীশ বিশ^াস ও নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম।
উপজেলার চৌঠাইমহল গ্রামের শেখ জাকির আহমেদ জানান, গত ২৩ মে তিনি তার গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের রাবেয়া খানম নামে নাজিরপুর বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। ডাঃ প্রীতীশ বিশ^াস তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এপেন্ডিক্স অপারেশন করাতে হবে বলে নাজিরপুর সার্জিক্যাল ক্লিনিকে যেতে বলে। তখন তিনি রোগীর পারিবারিক দারিদ্রতার কথা জানিয়ে হাসপাতালে অপারেশন করার অনুরোধ করেন কিন্তু তিনি হাসপাতালে অপারেশন হয় না জানিয়ে ফিরিয়ে দিলে বাধ্য হয়ে ওই ক্লিনিকে যান। সেখানে ডাঃ প্রীতীশ বিশ^াস ও নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম মিলে মেয়েটির অপারেশন করেছেন। অপারেশনের জন্য তারা ৭ হাজার টাকা নিয়েছে। গ্রাম থেকে চাঁদা তুলে ওই টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া তিনি আরো বলেন, ওই ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা শেষে রাবেয়া খানমকে যে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে সেখানে ওই ক্লিনিকের কর্তব্যরত চিকিৎক হিসেবে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম স্বাক্ষর করেছেন।
আল আমিন নামে একজন অভিযোগ করেন, ডাঃ প্রীতীশ বিশ^াস ও ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম দুজনই নাজিরপুরের ওই ক্লিনিকটির সাথে সরাসরি জড়িত। তারা দুজনেই হাসপাতালে অনডিউটি অবস্থায় ওই ক্লিনিকে অপারেশন করেন। তাছাড়া শামীম একজন ফার্মাসিষ্ট সহকারি হয়েও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার নির্ধারিত কক্ষে বসে নিয়মিত রোগী দেখেন এবং রোগীদের কাছে ফি নিয়ে ব্যবস্থাপত্রও দিয়ে থাকেন।
পরদিন বুধবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে দেখা যায়, ডা. প্রীতীশ বিশ^াস ও ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম হাসপাতালে তাদের নির্ধারিত কক্ষে রোগী দেখায় ব্যস্ত রয়েছেন। এ সময় মাকসুদা নামে এক রোগীর হাতে ডা. প্রীতীশ বিশ^াসের নাম সম্বলিত ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপত্র দেখা যায়। এ সময় ওই রোগী জানান, ডাক্তার প্রীতীশ বিশ^াস তার কাছে ১শ’ টাকা ফি নিয়েছেন। কথা হয় আসমা নামে অন্য এক রোগীর সাথে, তাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম। তিনিও জানান শামীম ডাক্তার তার কাছে ১শ’ টাকা ফি নিয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে একাধিক রোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি একটি পরিপুর্ণ সরকারি হাসপাতাল। এখানে সরকারিভাবে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার কথা জনসাধারনের। কিন্তু টাকা ছাড়া এ হাসপাতালে কোন সেবাই মেলেনা। অবস্থা এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন চিকিৎসার নামে বানিজ্য কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে।
অভিযোগে প্রকাশ, ৫০ শয্যার নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরী বিভাগে সামান্য কিছু চিকিৎসা সেবা পাওয়া গেলেও এ হাসপাতালে স্থানীয়ভাবে সম্ভব এমন জরুরী অপারেশন, সিজারিয়ান, এপেনডিক্স অপারেশনসহ হাসপাতালের কর্ম সময়ে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রও নিতে হয় টাকার বিনিময়ে। আবার এ হাসপাতালের এক শ্রেণীর চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা ক্লিনিক ব্যবসায় জড়িত।
নাজিরপুর হাসপাতাল থেকে মাত্র ৫০ গজের ভিতরে থাকা ওই ক্লিনিকটির অপরেশন বাণিজ্য জমিয়ে রাখতে সরকারি এ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা অনেকটা জটিল করে রেখেছে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
এমনও অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে কোন অপারেশনের রোগী এলে, এ হাসপাতালে চিকিৎসা সম্ভব নয়, ডাক্তার নেইসহ নানা অজুহাতে তাদেরকে ওই ক্লিনিকে ভর্তি হতে বলা হয়। পরে ক্লিনিকে নিয়ে ইচ্ছামত বিল ভাউচার করে রোগীদের পকেট কেটে টাকা নেয় ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সব থেকে অবাক হবার মত বিষয় হচ্ছে নাজিরপুর হাসপাতালের জরুরী এম্বুলেন্স সেবার অনিয়ম। হাসপাতালের এম্বুলেন্স পেতে হলে সরকারি নিয়মের বাইরে খুশী করতে হয় ড্রাইভারকে। এখান থেকে এম্বুলেন্স নিতে হলে ড্রাইভারের সাথে বিশেষ চুক্তি ছাড়া এম্বুলেন্স এর চাকা ঘুরবে না শত কান্নাকাটিতেও।
আবার হাসপাতালে চিকিৎসকদের সাথে রয়েছে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের বিশেষ কমিশন বাণিজ্য। বিভিন্ন কোম্পানী নির্দিষ্ট ঔষধ ব্যবস্থাপত্রে দেবার বিনিময়ে নগদ টাকার কমিশনসহ বিভিন্ন ধরনের উপহার দিয়ে চিকিৎসকদের অনেকটা কিনে নিয়ে থাকেন। সকাল থেকেই চিকিৎসকদের কক্ষে রোগীর চেয়ে ঔষধ কোম্পনীর প্রতিনিধিদের ভীড় থাকে বেশী। সেবা নিতে আসা রোগীরা এদের কারণে চিকিৎসকের কাছে রোগের বর্ননা ও সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারেন না।
অভিযোগের বিষয়ে কথা হলে ফার্মাসিষ্ট সহকারি শামীম বলেন, ‘হাসপাতালে ডাক্তার সংকটের কারণে বহির্বিভাগের রোগী মাঝে মধ্যে আমাকে দেখতে হয়। তবে নির্ধারিত ফি নেয়ার বিষয়টি সত্য নয়। খুশি হয়ে রোগীরা যা দেয় তা নেয়া হয়। তাছাড়া পরিচিত অনেক রোগীই চিকিৎসা নেয়ার জন্য সরাসরি আমার কাছে আসে।
আপনি ফার্মাসিষ্ট সহকারি হয়ে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেয়া বা অপারেশন করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আপনারা যদি বলেন তাহলে আর দেখবো না।
ডা. প্রীতীশ বিশ^াস বলেন, আমি এখানে গাইনী বিভাগের জুনিয়র কনসাল্টেন্ট হিসেবে কর্মরত আছি। সাধারণ অপারেশন করা আমার কাজ নয়। তাছাড়া বর্তমানে হাসপাতালে সাধারণ অপারেশন করার সরঞ্জামাদিও নেই। এ সরঞ্জামাদি সরবরাহের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করা হয়েছে। শীগ্রই আমরা সাধারণ অপারেশন শুরু করতে পারবো। তাছাড়া ডিউটি অবস্থায় আমি বাহিরে কোন রোগী দেখি না। আর হাসপাতালে রোগী দেখে ফি নেয়ার বিষয়টিও সত্য নয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা হলে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, ডা. প্রীতীশ বিশ^াস গাইনী বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট, তিনি সাধারণ অপারেশন করতে পারেন না। সাধারণ অপারেশনের জন্য কোন সার্জন আমাদের এখানে নেই এবং অপারেশনের সরঞ্জামাদিসহ এনেসথলজিষ্ট না থাকায় আমরা এপেনডিক্স অপারেশন করতে পারছি না। তার পরেও প্রতি মাসে আমরা কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০টি সিজারিয়ান অপারেশন করে থাকি। এনেসথলজিষ্ট না থাকার পরেও কিভাবে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয় এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রীতীশ বিশ^াসের এ বিষয়ে ৬ মাসের একটি প্রশিক্ষণ রয়েছে। তাকে দিয়েই আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. ফারুক আলম বলেন, বিষয়গুলো আমি নোট করে রাখলাম। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
