মোংলা থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত গড়ে তোলা হবে জ্বালানি অবকাঠামো : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মোংলা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গতিশীল করতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করতে চায় উল্লেখ করে মোংলাকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারণে চীনের বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের মোংলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ উপলক্ষে সিআরসিসির চেয়ারম্যান দাই হেগেনের নেতৃত্বে আসা উচ্চ পর্যায়ের চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য চীনা প্রতিনিধি দলকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি দিনটিকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের উল্লেখ করে দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসায় চীনের বিনিয়োগকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পক্ষে সংস্থাটির ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনস বিভাগের সদস্য সালেহ আহমেদ এবং চীনের পক্ষে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান লি চংইয়াং সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এমওইউ অনুযায়ী, দুপক্ষ জ্বালানি, শিল্প অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ করবে।
সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়ানো হচ্ছে
দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে উচিত জবাব দেবে।
বৃহস্পতিবার খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
এক দিনের সরকারি সফরে খুলনা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতে হেলিকপ্টারে বৃহস্পতিবার সকালে মোংলায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। মোংলায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি ‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর আওতায় চার হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী মোংলা থেকে হজরত খান জাহান আলী (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করতে যাওয়ার সময় কাটাখালীতে পথসভায় বক্তব্য দেন।
পথসভায় তারেক রহমান বলেন, যারা বিগত ১৫-১৬ বছরে দেশের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেনি, যারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, মানুষের অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার করে দিয়েছিল; আমরা দেখেছি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জনতার অভ্যুত্থানে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আজ তারা সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে। দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তারা দেশের মিল-কারখানা ভেঙে দিতে চাচ্ছে। এগুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায়, প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিক ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে আমরা ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। ২০২৪ সালে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের উচিত জবাব দিয়েছিল, সামনের দিনেও একইভাবে তাদের জবাব দেওয়া হবে। জনগণের সরকার দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে, পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সেটিকে এই যড়যন্ত্রকারীরা ভেস্তে দিতে চাইছে।
মজুরি বোর্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি, শ্রমিক ভাইবোনদের মজুরি নিয়ে কিছু দাবি-দাওয়া আছে। আপনারা দেখেছেন, এরই মধ্যে আমরা সে দাবিগুলো বিবেচনা করার জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করেছি। বোর্ড এরই মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে। আগামী দু-এক মাসের মধ্যে মজুরি বোর্ড নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করবে, যাতে শ্রমিক ভাইবোনেরা এর চেয়েও ভালো থাকতে পারেন।
বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সরকারপ্রধান উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়।
মোংলা বন্দর হবে নতুন অর্থনৈতিক হাব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা হলে এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোরসহ এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চগড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, বন্দরের সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহন সুবিধা সম্প্রসারণে সরকার উদ্যোগ নিতে চায়।
‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দর জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় পণ্য রপ্তানিতে একটি পরিপূরক বন্দর হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড, কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে এসব কাজ সম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং সারাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি মোংলা বন্দরে চলাচল করতে পারবে। এতে বন্দরের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।
অনুষ্ঠানে যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান দাই হেগেন বক্তব্য রাখেন। এ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হজরত খান জাহান আলী (রহ.) এর মাজার জিয়ারত
প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটে হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেছেন। বৃহস্পতিবার মোংলা বন্দরে নির্ধারিত কর্মসূচি শেষে তিনি মাজারে যান। এ সময় তিনি মাজারে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করেন।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস দ্বিতীয় আসর উদ্বোধন
বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭’ (সিজন-২) এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় তিনি বলেন, শিশু-কিশোরদের মেধা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতা বিকাশের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য অর্জনে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও বিদেশি ভাষা শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরে এরই মধ্যে ১৬ লাখের বেশি শিশু-কিশোর অংশ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী জুন মাসে এ আয়োজনের চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। দেশের ৫০০টির বেশি উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভিন্ন ইউনিটের শিশু-কিশোররা অনলাইনে এ প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে আসরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে অনলাইনে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিকেএসপির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পরিবেশনা উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া চীনের শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত দেশটির ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন ড্যান্স ও লায়ন ড্যান্সও উপভোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসেবে চীনের শিক্ষার্থীরা তাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করেন। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) ও ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়া প্রশিক্ষণ বিনিময় কার্যক্রম চালু রয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় বিকেএসপির প্রশিক্ষকরা চীনা বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটির প্রশিক্ষকরা বিকেএসপির শিক্ষার্থীদের চীনের ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট উশু প্রশিক্ষণ দেন।
