প্রধান সূচি

অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন

ধ্বসে যাচ্ছে বসতবাড়ি-রাস্তাঘাট, স্থাপনা ॥ হুমকির মুখে পরিবেশ

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার বিলাঞ্চলে নদী ও খালে স্থানীয়ভাবে তৈরী ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বসে যাচ্ছে। আর এতে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ।
স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব ড্রেজার (স্থানীয় ভাষায় বাংলা ড্রেজার) দিয়ে গ্রামাঞ্চলের নদী, খাল ও বিল থেকে যত্রতত্রভ ভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করায় আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ প্রশাসনের যোগসাজসে ড্রেজার মালিকরা এ অবৈধ কাজটি করে আসছে।
জানা গেছে, ড্রেজার দিয়ে উত্তোলনকৃত বালুর বেশিরভাগই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন টিআর, কাবিখা, ৪০ দিনের কর্মসূচির কাজে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে অনেকে কম খরচে নিচু জমি ভিটা তৈরীর ক্ষেত্রে সরকারি নদী ও খাল থেকে এ বালু উত্তোলন করে চরছেন। কম খরচে ও সহজ পদ্ধতিতে বালু পাওয়ায় বিধ্বংসী এই বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করা হচ্ছে। এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিষয়টি জানালেও তা কোনো কাজে আসছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে উপজেলার দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে এভাবে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কাজ চলমান রয়েছে। অবৈধ মেশিনগুলোর মালিকরা ঘুরে ঘুরে গ্রামের সরকারি রেকর্ডভুক্ত নদী ও খাল থেকে বালু উত্তোলন করছে। অবৈধভাবে এবং অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙ্গন হুমকিতে পড়েছে নদী ও খাল তীরবর্তী সরকারি সড়ক, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, বসতবাড়ী, রাস্তাঘাট।
জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলার বিলডুমুরিয়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন মেম্বারের বাড়ীর দক্ষিণ পার্শ্বে জনৈক মাহাবুব নামে এক ব্যক্তি অবৈধ বাংলা ড্রেজার ভাড়া করে সরকারি খাল থেকে বালু উত্তোলন করে চলছে।
খাল থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়ে বিলডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মাহাবুব বাহাদুর বলেন, আমাদের এলাকাটি বিল এলাকা। অত্র এলাকায় মাটির খুবই সংকট। তাই অনেকেই এভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে থাকে। আমিও সেইভাবে ড্রেজার ভাড়া করে বালু তুলছি। তবে আমি খাল থেকে বালু তুলছি না, আমি খালের পাড়ের আমার জায়গা দিয়ে বালু তুলছি।
বালু উত্তোলনে কাজে নিয়োজিত বাংলা ড্রেজার মালিক মো. আল-আমিন (৩৫) বলেন, ‘আমরা বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানের কর্মী মনির বালির মাধ্যমে ড্রেজার প্রতি ৩ হাজার টাকা নাজিরপুর থানার এস আই নাজমুলকে দেই, তবে আগে টাকা দেওয়া লাগতো না, এখন টাকা দেওয়া লাগে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ইউনিয়নে ১৫-২০টি ড্রেজার মেশিন রয়েছে। ডাক পড়লেই মেশিনপত্র নিয়ে গ্রামের আনাচে কানাছে ছুঁটে যাচ্ছে ড্রেজার মালিক ও শ্রমিকরা। কয়েক মাস আগে স্থানীয় ইউপি সদস্যরা ৪০ দিনের কর্মসূচির কাজে সরকারি খাল ও নদী থেকে অবৈধভাবে এসব ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে রাস্তার কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময়ে বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এলে কিছুদিন ড্রেজার চালানো বন্ধ ছিল। বর্তমানে আবার পুরোদমে শুরু হয়েছে। এখন প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রমরমা ভাবেই চলছে ড্রেজারের বালু উত্তোলন ব্যবসা।
ড্রেজার মালিকদের বক্তব্য, ‘সরকারি কাজে ড্রেজার ব্যবহারের ফলে এ নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় দু’মাস বন্ধ ছিল ড্রেজার। তবে আমাদের আগে কাউকে টাকা দেওয়া লাগত না। ড্রেজার বন্ধ হওয়ার পরে আবার চালু করার সময় এখন স্থানীয় চেয়ারম্যনের লোকজনদের টাকা দিয়ে আমরা আবার পুনরায় ড্রেজার চালানোর অনুমতি পেয়েছি।’
দেউলবাড়ি দোবরা ইউনিয়নের প্রতিনিধি মনির বালির সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ অবৈধ ড্রেজার ধরে সে জন্য গত জানুয়ারী মাসে আমার কাছে ড্রেজার মালিকরা আসছিল চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য। তবে ওরা (ড্রেজার মালিক) আদৌ থানায় টাকা পয়সা দেয় কি বা না দেয় তা আমি জানি না, তবে ওরা কেউ’ই আমার কাছে কোন টাকা দেয় না, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
এ বিষয়ে দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল আলম বাবুল জানান, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না, আমাকে ফাঁসানের জন্য এমন গুজব রটানো হচ্ছে, আমি এ ড্রেজার বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করছি।
নাজিরপুর থানার এস আই নাজমুল হোসেন বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আর মনির বালি নামে কোন ব্যক্তিকে আমি চিনিও না।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডা. সঞ্জীব কুমার দাশ জানান, বিষয়টি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে দেকা হবে। ড্রেজার চলন্ত অবস্থায় আমাকে তাৎক্ষনিক তথ্য দিলে সাথে সাথে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
এ বিষয়ে পিরোজপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান (পিপিএম, সেবা) বলেন, পুলিশ প্রশাসন এবং চেয়ারম্যন যদি অর্থের বিনিময় এমন কাজ করে থাকে আমি তদন্ত করে বিষয়টি দেখবো।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial