প্রধান সূচি

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ॥ গতি বাড়বে ব্যবসা বানিজ্যের

পিরোজপুরের কচা নদীতে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রবিবার সকাল ১১টায় সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সবসময় অবহেলিত। তাই তাদের অবস্থার উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করেছি। পদ্মা সেতুসহ দক্ষিণাঞ্চলে অনেক সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করেছি।
তিনি বলেন, কচা নদীতে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব সেতু উদ্বোধনের পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে আর কোনো বাধা থাকছে না। পিরোজপুরে প্রচুর পেয়ারা হয়। আমরা এখন থেকে ঢাকা বসেই খুব দ্রুত এই জেলার মজার পেয়ারা খেতে পারবো।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই অঞ্চলের এক ইঞ্চি জমিও যেনও অনাবাদি না থাকে। সারাদেশের মানুষকে পানি, বিদ্যু ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। সারা বিশ্বে মন্দা দেখা দিয়েছে, আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। দক্ষিণাঞ্চরের মানুষকে উৎপাদনমুখী হতে হবে। আমরা লবণাক্ত জমিতে ধান রোপণের জাতও উদ্ভাবন করেছি। আমরা আমাদের খাবার নিজেরাই উৎপাদন করবো।
কচা নদী দুই প্রান্তে সর্বস্তরের জনগণের সাথে প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পিরোজপুর প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম রেজাউল করিম এমপি ও কাউখালী প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।
পিরোজপুর প্রান্তে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমানের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন, জেলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট চন্ডী চরণ পাল, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার আমিনুল ইসলাম, সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শামীম আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ.কে.এম.এ আউয়াল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ হাকিম হাওলাদার, পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক, বরিশাল ডিজিএফআইর জিএস কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম, বরিশাল সড়ক বিভাগ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক মিন্টু রঞ্জন দেবনাথ, সড়ক বিভাগের প্রকল্প পরিচালক (সেতু) মো. আব্দুল আউয়াল মোল্লা, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী রেবেকা খান, ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্র সেতুর ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার (চায়না) মিস্টার ওয়েনচানমিং, বিভিন্ন পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, দলীয় নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শেণিপেশার মানুষ।
কাউখালী প্রান্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার খালেদা খাতুন রেখার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসাহাক আলী খান পান্না, সড়ক সেতু ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. শামিমুজ্জামান, পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ, উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাইদ মিয়া মুন, ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মিরাজুল ইসরাম, ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ.কে.এম আব্দুস শহিদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান তালুকাদর পল্টনসহ আওয়ামী লীগ ও অংগ সংগঠন, জাতীয় পার্টি জেপির অঙ্গ সংগঠন, ইউপি চেয়ারম্যানগণ, বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী সুবিধাভোগী দু’জন শিক্ষার্থীর সাথে সংযুক্ত হয়ে কথা বলেন। এরা হলেন পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী তাসনিমা জেরিন ও পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় দশম শ্রেণীর ছাত্র আতিফ মোস্তফা।
প্রধানমন্ত্রী প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুবিধাভোগীর সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে কথা বলেন। এরা হলেন কাউখালীর বেকুটিয়ার ভাসমান ব্যবসায়ী সোলায়মান হোসেন ও ক্ষুদ্র চায়ের দোকানী শিপ্রা কুন্ডু।


প্রধানমন্ত্রী জেলার আমড়া, পেয়ারা, ঐতিহ্য শীতলপাটি ও তার রাজনৈতিক জীবনে সন্ধ্যা নদী দিয়ে স্টিমার যাওয়ার পথে দীর্ঘ অবস্থানের কথা স্মৃতি চারণ করেন। এ নিয়ে তখন স্টিমারে বসে কবিতা ও গান লেখা হতো বলে জানান।
পরে দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মার জন্য দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।
সেতু উদ্বোধনের পরপরই সেতুর এ্যাপ্রোচের দুই প্রান্তে শত শত নারী-পুরুষ আনন্দ উল্লাস করে উঠে পড়ে এবং সেলফি তুলে উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে। পিরোজপুর সড়ক বিভাগ জানায়, রবিবার মধ্য রাত ১২টা থেকে নতুন টোলের ভাড়া কার্যকর হবে এবং এই রেটে যানবাহন চলাচল শুরু করবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিরোজপুর জেলার পিরোজপুর সদর উপজেলা ও কাউখালী উপজেলা মধ্যবর্তী বেকুটিয়া নামক স্থানে রাজাপুর-নৈকাঠি-বেকুটিয়া-পিরোজপুর জেলা মহাসড়কটি কচা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। কঁচা নদীর প্রস্থ প্রায় এক কিলোমিটার হওয়ায় এবং কোনো সেতু না থাকায় ফেরি পারাপারে প্রায় ১ ঘন্টা সময় লেগে যায়। বর্ষাকালে এ নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায় ও নদীর স্রোত তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে পারাপারের সময় আরো বেড়ে যায়। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়।


বিষয়টি অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০০ সালের ১০ জুন পিরোজপুরের একটি জনসভায় কচা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৩ সালে এ লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সাক্ষরিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার ও চীন সরকারের মধ্যে বেকুটিয়া নামক স্থানে ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। চার মাস বাকি থাকতেই নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে ২০২২ সালে ৪ সেপ্টেম্বর নবনির্মিত সেতুর উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারিত হয়।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নামকরণ করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এ সেতুর চালু হওয়ার মদ্য দিয়ে বরিশাল বিভাগের সঙ্গে খুলনা বিভাগের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। ফলে পায়রা সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে মোংলা সমুদ্র বন্দরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ যেমন স্থাপিত হবে, তেমনি বেনাপোল, ভোমরা, বাংলাবান্দা প্রভুতি স্থলবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর হবে।
স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়াতে অত্র সেতু সংলগ্ন জেলা সমূহের সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের ব্যাপক প্রসার লাভ করবে। সেতুটি এ অঞ্চলের জনসাধরণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি নিরাপদ, সময় সাশ্রয়ী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে কৃষি, ব্যবসা বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসার, চিকিৎসা লাভে সহজলভ্যতা সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে কুয়াকাটা সাগরসৈকত, সুন্দরবনসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের যাতায়াতে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করবে। এ সেতুটির মাধ্যমে রাজধানী থেকে বেনাপোল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হবে। পাশাপাশি পদ্মা সেতুর সুবাদে দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য এ সেতুটি বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করবে। সড়ক পথে বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক এ মহাসড়কটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার দৈর্ঘের হলেও যান চলাচলে সময় লাগত ৪ ঘন্টা। কচা নদীর বেকুটিয়া পয়েন্টে সেতুটি চালুর পর এ সময় এক ঘণ্টা কমে আসবে, থাকছে না ফেরির বিড়ম্বনা।


উল্লেখ্য ২০১৮ সালের জুলাই মাসে নির্মাণ কাজ শুরু করেন ৮ম বাংলাদেশ-চীন মেত্রী সেতু চায়না রেলওয়ের সেভেনটিন ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৯৯৮ মিটার, ২৮.৯৮ মিটার উচ্চতা ও ৪৫ মিটার চওরা এবং ৯টি স্প্যান নিয়ে এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৮৯৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকার ২৪৪ কোটি এবং বাকি ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় করে চায়না কোম্পানি। সেতুটি চায়না কোম্পানি গত ৭ আগষ্ট সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial