প্রধান সূচি

পিরোজপুর জেলা পরিষদের স্বর্ণালী অধ্যায়ের ইতি ঘটলো …

জেলা পরিষদ ভেঙ্গে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পিরোজপুরের জেলা পরিষদের স্বর্ণালী অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। গত পাঁচ বছর পিরোজপুর জেলা পরিষদকে ঘিরে ছিল সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের পদচারণা। জেলার সব ক্ষেত্রেই লেগেছিল উন্নয়নের ছোয়া। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষজনও।
জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন মহারাজ পিরোজপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় এ জেলা পরিষদ থেকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি জেলা পরিষদ থেকে এবং মহিউদ্দিন মহারাজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপকৃত হয়েছে সব শ্রেণি পেশার মানুষ। জেলার বেশ কয়েকটি বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পসহ জেলাব্যাপী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। আরও কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। সকলের কাছে পিরোজপুর জেলা পরিষদ ছিল একটি মডেল জেলা পরিষদ।
তবে হঠাৎ করে দেশের ৬১ জেলা পরিষদ বিলুপ্ত করায় দেওয়ায় কাজের ন্যূনতম স্বীকৃতি নিয়েও বাড়ি ফেরা হলো না জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের। একরকম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বুকে পুষে রেখেই চেয়ার ছেড়েছেন নির্বাচিত পরিষদ চেয়ারম্যানরা।
গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জেলা পরিষদ বিল পাস হয়। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কারণে গত রোববার ৬১ জেলা পরিষদ ভেঙে দেওয়ার গেজেট প্রকাশ করা হয়। ওই গেজেটে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (উপসচিব) নতুন প্রশাসক না বসানো পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা ৫ বছর দায়িত্বে থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে পাননি কাজের তেমন সুযোগ। উপমন্ত্রীর পদমর্যাদাসহ তাদের সব দাবিই রয়ে গেল অধরা।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরামের সদস্য সচিব ও পিরোজপুর জেলা পরিষদের সদ্য বিলুপ্ত চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ অনেক অসন্তোষের কথা জানান।
তিনি বলেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কোন পদ মর্যাদা ছিল না। একটি জেলায় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার থাকেন। সেখানে একজন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ মর্যাদা কি হবে সেটা ঠিক করা হয় নি। যে কারণে বিভিন্ন কাজে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়। জাতীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক বা সরকারী কোন অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারদের পরে বা তাদের পাশে বসতে হয় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে। এটি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ার দাবী ছিল, কিন্তু সেটিও দেওয়া হয়নি। ফলে কাজের ক্ষেত্রে জেলার সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করাটা ছিল বেশ জটিল।
তবে পিরোজপুরের কিছু আশার কথাও জানান মো. মহিউদ্দিন মহারাজ। তিনি বলেন, গত ৫ বছরে তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালে পিরোজপুর জেলা পরিষদকে জনমূখী করেছেন। জেলা পরিষদকে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিনত করতে পেরেছেন। জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় স্বচ্ছতার সাথে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। করোনাকালীন সময়ে জেলা পরিষদ আত্মমানবতার সেবায় কাজ করেছে। জেলার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী প্রদানসহ জেলার হাসপাতালগুলোতে করোনা চিকিৎসা উপকরণ প্রদান করা হয়েছে।
জেলার প্রবেশদ্বারগুলোতে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংযুক্ত গেট নির্মান করা হয়েছে। পিরোজপুর জেলা পরিষদ ভবনকে একটি আধুনিক জেলা পরিষদ ভবনে রূপান্তরিত করাসহ জেলা পরিষদ প্রাঙ্গনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পরিষদের মাধ্যমে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় একটি আধুনিক সুপার মার্কেট নির্মান করা হয়েছে। জেলার ভান্ডারিয়ার হরিণপালায় ৪ তলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক ডাকবাংলো নির্মান করা হয়েছে। নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলা সদরে ৪ তলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক ডাকবাংলো নির্মান কাজ চলমান। এছাড়া জেলার প্রতিটি উপজেলায় স্কুল, কলেজ মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন প্রকল্প এবং গ্রামীন রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের অনুদান প্রদান, মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসা সহায়তা সহায়তা প্রদানের ফলে এসব শ্রেণির লোতজন জেলা পরিষদের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে।
স্থানীয় রাজনীতিতে জেলা পরিষদ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে বলেও দাবী করেন মহিউদ্দিন মহারাজ। তিনি বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত হওয়ায় পাশাপাশি সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মীরাও উপকৃত হয়েছে।
আগামী নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, নির্বাচন কমিশন দ্রুত সময়ের মধ্যেই জেলা পরিষদের নির্বাচন দিবেন এবং সে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবো।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরে রাজনীতিতে সম্মান, গ্রহনযোগ্যতা বেড়েছে বলে দাবী করে মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ার কারণে দলীয় রাজনীতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনে তার গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃর্ণমূল পর্যায়ের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে একটা সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। তাই আগামীতে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদেও তিনি প্রার্থী হবেন বলে জানান।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনে পরিষদ চেয়ারম্যানদের সুর্নিদিষ্ট পদ মর্যাদা ও সরকারী প্রটৌকল দেওয়ার দাবী জানান তিনি।
উল্লেখ্য, সরকার জেলা পরিষদ আইন-২০০০ সংশাধন করে জেলা পরিষদ আইন-২০২২ প্রণয়ন করেছে। গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জেলা পরিষদ বিল পাস হয়। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কারণে গত ১৭ এপ্রিল ৬১ জেলা পরিষদ ভেঙে দেওয়ার গেজেট প্রকাশ করা হয়। ওই গেজেটে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (উপসচিব) নতুন প্রশাসক না বসানো পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারাই জেলা পরিষদের দায়িত্বে থাকবেন। যে কোনো ব্যক্তিকে ১৮০ দিনের জন্য প্রশাসক বসানোর সুযোগ রাখা হয়েছে সংসদে পাস হওয়া আইনে।
এদিকে জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০২২ এর অনুযায়ী জেলা পরিষদ সমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ শাখা থেকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ তানভীর আজম ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০২২ এর অনুযায়ী নুন্যতম সময়ের মধ্যে জেলা পরিষদের পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial