ফুলের চারায় নীরব বিপ্লব নার্সারি পল্লী অলঙ্কারকাঠিতে
পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলায় ফুলের চারায় নিরব বিপ্লব ঘটছে নার্সারি গ্রাম হিসেবে সুপরিচিত অলঙ্কারকাঠিতে। ফলস্বরূপ ফুল চারার নার্সারিতে অর্থনৈতিকভাবে ক্রমেই বিকাশ ঘটছে ওই এ উপজেলায়। গ্রামের ছোট বড় দুই শতাধিক নার্সারিতে এখন ফুলের চারা উৎপাদনে ধুম পড়েছে। সকল নার্সারিতে ফুলে ফুলে ভরে গেছে। দূর থেকে যে কেউ দেখলে প্রথমে মনে হবে যেন ফুলের গালিচায় ঢাকা পুরো গ্রাম। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত থাকবে নার্সারি ভর্তি ফুল। প্রতিদিন এসব নার্সারিতে বিশ লক্ষাধিক টাকার বেচা-বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
২০০২ সালে অলঙ্কারকাঠি বেইলি সেতুর পশ্চিম পাড়ে কৃষ্ণকাঠি গ্রামের একখন্ড জমি নিয়ে পানাউলাপুর গ্রামের মো. শাহাদাৎ হোসেন প্রতিষ্ঠা করেন বৈশাখী নার্সারি। এর কয়েক বছর পর জাহিদুল ইসলাম পলাশ প্রতিষ্ঠা করেন ছারছীনা নার্সারি। একই সময় গড়ে ওঠে তৌহিদের আশা নার্সারি। এক এক করতে করতে বর্তমানে অলঙ্কারকাঠি গ্রামসহ কাছাকাছি এলাকা মিলিয়ে ওখানে দুই শতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে।
মিলবে এই ফুলের গ্রাম হিসেবে পরিচিত অলঙ্কারকাঠি। ওই সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার দু’পাশে দু’দিকে যতদূর চোখ যায়, সর্বত্রই দেখা যাবে বাহারি ফুলের সমাহার। মনে হবে যেন ফুলের গ্রাম অলঙ্কারকাঠি। শীত মৌসুমে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ফুলপ্রেমীদের পদভারে এখন মুখর থাকে সকল নার্সারি। অলঙ্কারকাঠি বেইলি সেতু থেকে উত্তর শর্ষিনা পর্যন্ত সড়কের দু’ধারে প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা দুই শতাধিক নার্সারিতে ফুলের চারা কেনাবেচা এখন জমজমাট। দু’সহস্রাধিক পরিবারের কর্মসংস্থান করে দিয়েছে এই নার্সারি গ্রাম অলঙ্কারকাঠি।
আয়সা-সিদ্দিকা নার্সারির মালিক মো. সাখাওয়াত বলেন, তিনি ১০ বছর ধরে নার্সারি ব্যবসায় জড়িত। তিনি ৪০ শতাংশ জায়গায় এ বছর এগার হাজার ফুলের চারা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তার নার্সারিতে সব সময় তিন থেকে চারজন মানুষ কাজ করে। এ বছর তার নার্সারিগুলোতে গোলাপ, ডালিয়া, কেনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ইনকা গান্ধা, গাঁদা, জিনিয়া, কেনিডোলাসহ আঠার প্রজাতির ফুলের চারা দিয়েছেন। শ্রেণিভেদে এক একটি চারার দাম ৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। প্রতিদিন তার নার্সারিতে ৫/৮ হাজার টাকা বিক্রি হয়। সাখাওয়াত আরো বলেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ফুলের ভরা মৌসুম। এই সময়ে এখানকার প্রতিটি নার্সারিতে কেনা বেচার ধুম চলে। তবে করোনার থাবায় দু’বছরে বেশ কিছু নার্সারির মালিক ধার দেনায় জড়িয়ে পড়েছেন। সাখাওয়াত এ বছর এই তিন মাসে পাচ লাখ টাকার ফুল চারা বিক্রি করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
ওইসব নার্সারি থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ফুলের চারা ও বিভিন্ন গাছ-গাছালির চারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। শীত মৌসুম চলে শুধুই ফুলের চারা কলমের বিকিকিনি।
কুনিয়ারি গ্রামের আব্দুল হাই (৬০) নামে এক নার্সারি মালিক জানান, দেড় বিঘা জমিতে ফুলের চারা কলমের নার্সারিতে সব খরচ বাদ দিয়ে চার থেকে দশ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে নার্সারিতে ভাল বেচা-বিক্রিতে উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকার দরকার। তিনি বলেন এ বছর তিনি এক বিঘা জমিত ফুলের চারা দিয়েছেন। প্রতিদিন তার নার্সারিতে দশ থেকে পনের হাজার টকার ফুল চারা বিক্রি হয়। তার নার্সারিটি নদীর ধারে খালের পাশে হওয়ায় ফুল প্রেমি শৌখিন বড় কোন ক্রেতারা আসতে পারছেন না। তাই তার নার্সারিতে উল্লেখযোগ্য বেচা বিক্রি হচ্ছেনা। বড় ক্রেতারা অলঙ্কারকাঠির রাস্তার পাশে গাড়ি নিয়ে এসে ফুলের চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের এখান থেকে বড় রাস্তার সাথে যোগাযোগোর জন্য চেয়ারম্যন মেম্বাররা যদি কোন সাকো পুল করে দিত তাহলে আমাদের বিকিকিনি অনেক বেড়ে যেত। তিনি বলেন আমার মত এখানে আরো শতাধিক নার্সারি একই সমস্যায় ভুগছেন। তারা আরো অভিযোগ করেন নার্সারিতে চারা উৎপাদনে তারা নূণ্যতম কোন সরকারি সহযোগিতাও পাচ্ছেন না।
নার্সারি মালিক শাহাদাৎ হোসেন ও আশা নার্সারি মালিক তৌহিদ জানান, ঢাকার বীজ বিক্রির দোকান ও বিভিন্ন কোম্পানির এজেন্টের কাছ থেকে বীজ কিনে আশ্বিন মাসে বীজতলা করে বীজ বপন করতে হয়। ১৫-২০ দিন পর চারা গজালে পলিথিন প্যাকেটে স্থাপন করে পানি ও ওষুধ দিতে হয়। ওইসব গাছে অগ্রহায়ণ মাসে ফুল আসতে শুরু করে। চৈত্র মাস পর্যন্ত ফুলের ভরা মৌসুম। জমি চাষ থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি নার্সারিতে ৮ থেকে ১০ জন করে শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও কাজ করেন। এজন্য নারীদের ৩০০ টাকা ও পুরুষদের ৪৫০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়। নার্সারি মালিকরা জানান, ফুলের চারা কলমে নার্সারিতে সব খরচ বাদ দিয়ে তিন থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চপল কৃষ্ণ নাথ বলেন, উপজেলায় ৫০০ হেক্টর জমিতে দুই হাজার নার্সারি রয়েছে। নার্সারি ব্যবসায়িদের জন্য আমাদের পক্ষ পৃথক কোন সুযোগ সুবিদা নেই। আমাদের সম্পর্কটা বেশি থাকে রবি শষ্য চাষিদের সাথে। তবে সম্প্রতি আমরা উপজেলা থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের ৬০ জন চাষিদের একদিনের প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
