মোংলায় বিদেশী জাহাজ কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা চোরাকারবারী চক্র বেপরোয়া
মোংলা বন্দরের বিদেশী জাহাজ কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ চোরাচালানী চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বন্দরের প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে গড়ে ওঠা এ চক্রের শক্তিশালী সদস্যরা বন্দরে আগত বিভিন্ন বিদেশী জাহাজ থেকে নদী পথে জ্বালানী তেল, মবিল, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, সিগারেট, রং, ব্যারেল, সোলার প্যানেল, গ্যাসের চুলা, নানা ধরনের লোহা, ঢাল কাঠ, ওয়ার রোপ, হাসিল (জাহাজ বাঁধার বড় রশি), ইলেকট্রনিক্স পণ্য, নানা ধরনের মাদকসহ (বিদেশী হুইস্কি, বিয়ার, হেরোইন, ইয়াবা) বিভিন্ন মূল্যবান জিনিষপত্র অবাধে পাচার ও লুটপাট করে আনছে। কাষ্টমস, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বন্দর প্রহরীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারী চক্রের সদস্যরা দিনে রাতে সমানে দেদারছে এসব পণ্য পাচার ও লুটপাট করলেও অবৈধ পণ্য আটকের ঘটনা তুলনামুলক অনেকটাই কম ঘটছে। মাঝে মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে চোরাচালানের পণ্যসহ ছোট খাট চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও এদের রাঘববোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরে।
চোরাচালানী চক্রের প্রভাবশালী সদস্যদের বিরুদ্ধে থানা পুলিশ ও আদালতে বিভিন্ন মামলা থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে এরা বিদেশী জাহাজ কেন্দ্রিক চোরাচালান চালিয়েই যাচ্ছে।
এদিকে, জাহাজ থেকে চোরাকারবারের মাধ্যমে সরকার একদিকে যেমন মোটা অংকের টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে বন্দরের বৈধ ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় মারাত্মক মার খেয়ে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে কোস্টগার্ড মোংলা (পশ্চিম) জোনের সদস্যরা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বিদেশী জাহাজ থেকে চোরাচালানী চক্রের পাচার করে আনা দু’টি বড় ধরনের চোরাচালানের চালান আটক করতে সক্ষম হয়েছে। এসময় কোস্টগার্ডের হাতে উদ্ধার অবৈধ পণ্য থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বন্দরের জাহাজের চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত ও একাধিক আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, মোংলা শহরের রিজেকশন গলি, বাইদ্যা পাড়া, কানাই নগর, কুমারখালী, কলেজ মোড়, জয় বাংলা, মাদ্রাসা রোড়, মালগাজি, রাতারাতি কলোনী, দ্বিগরাজ, বাজুয়া, লাউডোব, চিলা বাজার, বানীশান্তা বাজার, মাছ মারা, নারকেল তলা, জয়মনীর ঘোলসহ বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বিদেশী জাহাজ কেন্দ্রিক গড়ে ওঠেছে শক্তিশালী চোরাচালান চক্র। এসব চক্রের অসাধু সদস্যরা নদী পথে ট্রলার ও নৌকাযোগে পশুর চ্যানেলে অবস্থানরত বিদেশী জাহাজের নাবিকদের সাথে আঁতাত করে প্রতিনিয়ত চোরাচালান পণ্য মোংলাসহ আশপাশের লোকালয়ে পাচার করে চলছে। এতে করে সরকার একদিকে মোটা অংকের টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরের বৈধ ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় মার খেয়ে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোর রাতে বন্দরের প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে গড়ে ওঠা এ চক্রের শক্তিশালী সদস্যরা বন্দরে আগত একটি বিদেশী জাহাজ থেকে নদী পথে নৌযান যোগে ৩৯টি ড্রামে ১ হাজার ৯৫০ লিটার লুব ওয়েল (জ্বালানী তেল), ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, গ্যাসের চুলা, গ্যাসের সিলিন্ডারসহ কয়েক লাখ টাকার বিভিন্ন মূল্যবান জিনিষপত্র অবাধে পাচার ও লুটপাট করে আনে। গোপন সূত্রে এ খবর পেয়ে কোস্টগার্ড মোংলা (পশ্চিম) জোনের সদস্যরা পশুর নদীর জয়মনী এলাকায় অভিযান চালিয়ে চোরাচালানী চক্রের নৌযান বোঝাই পাচার করে আনা চোরাচালানের পণ্যসহ ৩ চোরাচালানীকে আটক করে রাতে মোংলা থানায় হস্তান্তর করে।
আটককৃত চোরাকারবারীরা হলেন, চাদঁপাই ইউনিয়নের কানাইনগর এলাকার বুলু খাঁ’র ছেলে নিয়ামুল খাঁ, পৌরসভা ৭নং ওয়ার্ডের জয় বাংলা সড়কের রফিকুল ইসলাম ও একই এলাকার মৃত মিনহাজ উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে হারুন হাওলাদার।
মোংলা থানার ওসি ইকবাল বাহার চৌধুরী জানান, আটক তিন চোরাচালানীর বিরুদ্ধে সোমবার ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৭ আগস্ট রাতে পশুর নদীর হারবাড়িয়া জোংড়ার খাল এলাকার জাহাজ থেকে চোরাই পথে পাচারের সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় ৫০ ব্যারেল ডিজেল তেল আটক করে। এ সময় চোরাচালানী চক্র কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে তেল বোঝাই ট্রলারটি নদীতে ডুবিয়ে দেয়াসহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে জব্দকৃত তেল মোংলা থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এ ব্যাপারে কোস্টগার্ডের পশ্চিম (মোংলা) জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লে. কমান্ডার শাহরিয়ার পারভেজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কোস্টগার্ড এর এখতিয়ারভূক্ত এলাকাসমূহে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, মৎস্য সম্পদ রক্ষা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চোরাচালানেও কোস্টগার্ড জিরো টলারেন্স নীতি অবল¤¦ন করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কমান্ডার নুর মুহাম্মদ এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, বন্দরের চ্যানেল তথা নৌ-পথের দায়িত্ব কোস্ট গার্ডের। আর বন্দরের স্থলভাগের দায়িত্ব পালন করছে বন্দরের নিরাপত্তা রক্ষীরা। এ ক্ষেত্রে বন্দরের সাথে সমন্বয় করে কোস্টগার্ড তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে চলেছে।
মোংলা থানার ওসি ইকবাল বাহার চৌধুরী জানান, বন্দর এলাকায় চোরাচালান বন্ধে পুলিশসহ বিভিন্ন আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা জোরালো তৎপরতা চালাচ্ছে। কোস্টগার্ডের হাতে জব্দ চোরাচালান পণ্যের সাথে জড়িতদের নেপথ্যের প্রভাবশালী মহলকে পুলিশ খুঁজে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।
