বানারীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক ।। লাগেজ পার্টির সদস্য থেকে কোটিপতি
গোলাম ফারুক। বানারীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান। বর্তমানে তরুনী ধর্ষনের অভিযোগের মামলায় আসামী হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। শিল্পপতি পরিচয়ে তিনি হঠাৎ করে রাজনীতির মাঠে নামেন। তবে দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস ছিল না গোলাম ফারুকের। অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সংস্পর্শে গিয়ে রাতারাতি হয়ে ওঠেন দলটির নেতা। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০০৯ সালে বানারীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে নির্বাচিতও হন। তার পর থেকেই গোলাম ফারুক বানারীপাড়ায় শুরু করেন তার দুঃশাসনের খেলা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গত ২৪ অক্টোবর এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে ঢাকার ভাটারা থানায় ফারুকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর পর থেকে পলাতক ফারুক। বন্ধ রয়েছে তার ফোন নম্বর। তার বিরুদ্ধে এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন বানারীপাড়া উপজেলার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলার পদ থেকে বহিস্কার হয়েছেন ফারুক।
যেভাবে শুরু : ২০০৮ সালে হঠাৎ করেই বানারীপাড়ার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ ঘটে গোলাম ফারুকের। বানারীপাড়ার সাবেক এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, প্রথমে বিএনপির রাজনীতি করার টার্গেট নিয়ে বরিশাল-২ আসনের বানারীপাড়া ও উজিরপুর উপজেলার সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচুর দান-অনুদান দিতে থাকেন তিনি। দুই উপজেলার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্যও গড়ে উঠেছিল তার। তবে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি ঘটলে ভোল পাল্টাতে শুরু করেন তিনি। তখন বরিশালের দুই শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে বনে যান আওয়ামী লীগ নেতা। সময়ের ব্যবধানে পেয়ে যান আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা শাখার পদ। দলটির মনোনয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বানারীপাড়া উপজেলা পরিষদে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গোলাম ফারুকের বাবা মোতাহার উদ্দিন বানারীপাড়ার চাখার কো-অপারেটিভ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন মানুষের স্বাক্ষর জাল করে ঋণ নেওয়ায় কারাভোগ করেন। এরপর এলাকা ছাড়েন গোলাম ফারুক। ২০০০ সালের দিকে মামাবাড়ির কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি জমান ফারুক। ঢাকায় শুরু করেন ভারতীয় শাড়ির কালোবাজারীর ব্যবসা। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে হাওয়া ভবনের অন্যতম নায়ক সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চোরাই স্বর্ণ বহনের দায়িত্ব দেন ফারুককে। এর ফলে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ব্লাকার ফারুক’ নামে। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, চোরাই স্বর্ণ ব্যবসার আগে গোলাম ফারুক সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের লাগেজ পার্টির সদস্যও ছিলেন। দুবাই থেকে বাংলাদেশে চোরাই স্বর্ণ আনার বাহক হিসেবে গোলাম ফারুক রাজধানীতে তখন ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পান। একবার বিপুল চোরাই স্বর্ণসহ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফারুক ধরা পড়লে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও হাওয়া ভবনের অপর কর্ণধার গিয়াসউদ্দিন আল মামুন প্রভাব খাটিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেন। তখন একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয়েছিল।
স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যবসায় জড়িয়ে গোলাম ফারুক হঠাৎ করেই বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে যান। ২০০৬ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতন হলে ফারুকের চোরাই স্বর্ণ ব্যবসায় ভাটা পড়ে। ওই সময়ে দুবাইয়ে ফারুকের কেনা ফ্ল্যাট সিলগালা করে দিয়েছিল দুবাই পুলিশ।
ঢাকা ও বরিশালে সম্পদের পাহাড় : দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে বানারীপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি কেনেন গোলাম ফারুক। বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীর পশ্চিম তীরের বিভিন্ন গ্রামে ফারুক নামে-বেনামে কিনেছেন কয়েকশ’ একর জমি। বরিশাল নগরের ফড়িয়া পট্টিতে রয়েছে তার কয়েক কোটি টাকার বিশাল বাড়ি। রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে দু-তিন বছর আগে প্রায় পাঁচ একর জমি কিনেছেন তিনি। এছাড়া ধানমন্ডিতে একটি, উত্তরায় দুটি এবং বসুন্ধরায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আছে ফারুকের। এক বছর আগে পণ্যবাহী জাহাজ তৈরির জন্য একটি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানে ১৫ কোটি টাকা দিয়েছেন ফারুক। আমেরিকায় স্ত্রীর নামে বাড়ি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থ রয়েছে তার। সরকারি গাড়ি ছাড়াও কয়েক কোটি টাকা মূল্যের তিনটি গাড়ি ব্যবহার করেন ফারুক।
চাকরির নামে অর্থ লোপাট : নিজেকে শিল্পপতি পরিচয় দিয়ে রাজনীতিতে এলেও গোলাম ফারুকের মালিকানাধীন কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান নেই। দৃশ্যমান বৈধ আয়ের কোনো উৎসও নেই তার। বানারীপাড়াবাসীর অভিযোগ, পরপর দু’বার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে এ উপজেলার কয়েকশ’ মানুষের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
উপজেলার শিয়ালকাঠি গ্রামের মালেক চৌকিদারের ছেলে সুমন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার জন্য ফারুক সুমনের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিলেও ভাগ্য খোলেনি সুমনের। টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না দুই বছর ধরে। একই গ্রামের তরুণ প্রতিবন্ধী তানভীর বানারীপাড়া বন্দরের একটি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকানে চাকরি করেন। এই তানভীরের কাছ থেকেও দুই লাখ টাকা নিয়েছেন ফারুক চাকরি দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু প্রতিবন্ধী তানভীরের চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না।
“মিস্টার থার্টিন পার্সেন্ট” : চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বানারীপাড়া উপজেলায় ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সাত গ্রুপের প্রায় পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ পছন্দের লোকদের মধ্যে ভাগবন্টন করেন গোলাম ফারুক। অভিযোগ রয়েছে, ১৩ পার্সেন্ট হারে কমিশন নিয়ে কাজগুলো পছন্দের ঠিকাদারদের পাইয়ে দেন তিনি। এ ঘটনায় ওই কাজের জন্য দরপত্র ক্রয়কারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খন্দকার ব্রাদার্সের পক্ষে মো. জিয়াউদ্দিন জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলেছেন, নিয়ম অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে কাজগুলো ঠিকাদারদের মধ্যে বন্টনের নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। তাই পুনরায় লটারির দাবি জানিয়ে খন্দকার ব্রাদার্সের পক্ষে তিনি আবেদন জানিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বানারীপাড়ার এক শীর্ষ ঠিকাদার অভিযোগ করেন, গত ১০ বছর বানারীপাড়ার সব উন্নয়ন কাজ ভাগবন্টন হয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম ফারুকের নেতৃত্বে। তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১৩ পার্সেন্ট হারে কমিশন নিয়ে সব কাজ বন্টন করেন তিনি। তার এ কমিশন-বাণিজ্য ও ভাগবন্টন নীতি এখন বানারীপাড়ায় অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ আছে, উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এক যুগ ধরে বানারীপাড়ার প্রকৌশল দপ্তরে কমিশন-বাণিজ্যের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি।
তবে অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও ফারুকের নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
