১২ নভেম্বর উপকূলের ১৬ জেলা পালিত হচ্ছে ‘উপকূল দিবস’
উপকূলবাসীর জীবনমান উন্নয়নসহ উপকূল সুরক্ষার লক্ষ্য সামনে রেখে এবার দেশে এবার দ্বিতীয় বারেরমত ‘উপকূল দিবস’ পালিত হচ্ছে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের দিনটিকে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এদিন উপকূলের ৫৪ স্থানে একযোগে ‘উপকূল দিবস’ পালিত হবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, ঘূর্ণিঝড়ে প্রয়াতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জলন এবং স্মারকলিপি পেশ।
পটুয়াখালীর গলাচিপায় ১০০১টি মোমবাতি প্রজ্জনের মাধ্যমে কর্মসূচি পালিত হবে। একই কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বরগুনার তালতলীর শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত এবং লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে। দিবসটি স্মরণে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হরিনগরে ফটো প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। অন্যান্য স্থানে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও উপকূল দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হবে। ঢাকায় পল্টনের মুক্তি ভবনের প্রগতি হলে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ উপকূলবর্তী ১৬ জেলার ৫৪ স্থানে দিবসটি পালিত হবে।
উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটির আহবানে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের শতাধিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবস পালনে এগিয়ে এসেছে। এরমধ্যে রয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যম কর্মীদের সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, কিশোর-তরুণদের ফোরাম। দিবস পালনের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপকূল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ-সিজেএফবি, কোস্টাল ইয়ূথ নেটওয়ার্ক-আলোকযাত্রা। এবারের কর্মসূচিতে সহযোগী হিসেবে রয়েছে নৌ-সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি, নির্ঝর এন্টারপ্রাইজ, দৈনিক খোলাকাগজ এবং বিডিমিরর একাত্তর ডটকম।
উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ও উপকূল-সন্ধানী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেন, উপকূলের দিকে গণমাধ্যম ও নীতি নির্ধারকদের নজর বাড়িয়ে উপকূলবাসীর জীবনমান উন্নয়ন ঘটানোই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। এক যুগেরও বেশি ধরে উপকূল নিয়ে নিবিড়ভাবে রিপোর্টিং করতে গিয়ে আমি উপকূল দিবসের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি। উপকূলের জন্য একটি পৃথক দিবস থাকলে উপকূল ভাবনা সবার মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল, সংবাদ মাধ্যম থেকে শুরু করে সকল মহলে উপকূল-ভাবনার সুযোগ বাড়বে। এর মধ্য দিয়ে উপকূল সুরক্ষা এবং সেখানকার নাগরিকেদের অধিকার নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।
১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপকূলবাসীর কাছে স্মরণীয় দিন হিসেবে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরকেই ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এদিন বাংলাদেশের উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যায় সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ভোলা সাইক্লোন’। এই ঘূর্ণিঝড় লন্ড-ভন্ড করে দেয় উপকূল। বহুমানুষ প্রাণ হারান। ঘর-বাড়ি হারিয়ে পথে বসেন। এই ঘূর্ণিঝড় গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ৩ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ৮ই নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হয়। ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১১ নভেম্বর এটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘন্টায় ১৮৫ কিলোমিটারে পৌঁছায়। ওই রাতেই উপকূলে আঘাত হানে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখের বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতি আবহাওয়া ঘটনার শীর্ষ তালিকা প্রকাশ করে গত বছরের ১৮ মে। ওই তালিকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলেরও পর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়টিকে পৃথিবীর সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতি ঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে উইকিপিডিয়ার সূত্র বলছে, এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড় সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্নিঝড়।
১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় স্মরণে এই দিনটিকে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি ওঠে ২০১৭ সালে। সে বছর থেকেই দেশের সমগ্র উপকূল অঞ্চল জুড়ে উপকূল দিবস পালিত হয়ে আসছে। প্রথম বারের মত উপকূল দিবস পালনে গোটা উপকূল জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে। তারা উপকূলের জন্য একটি দিবসের দাবি তোলেন এবং ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। প্রথম বছরের বিপুল সাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবার দ্বিতীয় বছর আরও বৃহৎ পরিসরে উপকূল দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়া হলো।
উল্লেখ্য, পূর্বে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর এবং পশ্চিমে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কালিঞ্চি গ্রাম পর্যন্ত সমুদ্ররেখা বরাবর উপকূলের প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমূখী দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করেন। কেবল দুর্যোগ এলেই সংবাদ মাধ্যমে এদের খবরাখবর দেখা যায়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও তাদের জীবন যে কতটা অস্বাভাবিক, সে বিষয়ে খুব একটা খোঁজ রাখা হয়না। উপকূল দিবসের দাবি বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলেও উপকূলের বিশেষ খবরের দিকে সংবাদ মাধ্যমের নজর পড়বে।
