প্রধান সূচি

ভাঙ্গা চালের নিচে বাস ॥ নিরাপদ পানির অভাব

আশ্রায়ন প্রকল্পের ব্যারাকগুলোর বেহাল দশা

পিরোজপুরের কাউখালীতে আশ্রায়ন প্রকল্পের ব্যারাক হাউজগুলোতে করুন অবস্থা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন মেরামতের অভাবে ব্যারাকে ঘরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ছাউনির টিন মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকে ঘরের মধ্যে পানি পড়া ঠেকাতে পলিথিন টানিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ২০০৭ সালের সিডরে বিধ্বস্ত ঘরগুলো আজও সংস্কার করা হয়নি। এছাড়া লেট্রিন ও নলকুপ গুলো অকেজো। শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ শিশুরাই জড়িয়ে পড়ছে শিশু শ্রমে। যুবক শ্রেনীর অনেকে জড়িয়ে পড়ছে মাদকসহ নানা অপরাধের সাথে। ব্যারাক হাউজে সমবায় সমিতি থাকলেও তা চালু নেই।
চারটি আশ্রায়ন প্রকল্পের অধিকাংশ ব্যারাক গুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। বাসিন্দারা জানে না ব্যারাকগুলো মেরামত কোন কর্তৃপক্ষ করবে বা কেউ করবেন কি না। আশ্রায়নের বাসিন্দারা ১৩ বছরেও তা জানতে পারেনি। তাদের দুরাবস্থার কথা মন্ত্রী, এমপি জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে জানালেও কোন সুফল পাচ্ছেনা বলে আবাসনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে ওইসব আশ্রয়ন প্রকল্প ঘুরে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে জেলার কাউখালী উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছোট বিড়াল জুড়ি এলাকায় ব্যারাক হাউস নির্মান শুরু হয়। ২০০১ সালে দুইটি ব্যারাকে মোট ৪৫টি ঘর নির্মান করে ৪৫টি অসহায়, দুঃস্থ ও গৃহহীন মানুষের মধ্যে বরাদ্ধ দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় বড় বিড়ালজুরিতে জাপানের সহযোগিতায় ১০০ পরিবারের আবাসের ব্যবস্থা করা হয়। পর্যায়ক্রমে আমড়াজুরি ইউনিয়নের আমড়াজুরিতে ও গন্ধর্ব এলাকায় দু’টি প্রকল্পে ১০০ করে মোট ২০০টি পরিবারের মাথা গোজার ঠাই করে দেয়া হয়। বালাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা ওই ব্যারাক হাউস গুলো নির্মান করে। পরবর্তিতে অসহায় ছিন্নমূল পরিবারেরে মাঝে বরাদ্ধ দিয়ে ঘরগুলো হস্থান্তর করার পর থেকেই তারা বসবাস করে আসছে।
২০০৭ সনের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার ঘরগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছোট বিড়ালজুরি এলাকার ব্যারাকের ২টি ঘর বির্ধ্বস্ত হয়ে গেলে আজো একই অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোন কোনটির ব্যারাকের টিনের চালা বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ছিদ্র হয়ে গেছে। চালের টিন চাপা দেওয়ার ফ্লাটবারের নিচ থেকে বেশির ভাগ ব্যারক হাউজের টিনগুলো মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে দুই ভাগ হয়ে গেছে। যার ফলে বৃষ্টি হলেই সব পানি ঘরের ভেতরে পড়ে। বড় বিড়ালজুরির জাপানী ব্যারাক হাউজে কিছু দিন পূর্বে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১০টি ঘর পুড়ে যায়। এছাড়া অনেকগুলো ঘর নষ্ট হয়ে গেছে।
ছোট বিড়ালজুরি আশ্রায়নের বাসিন্দা মাকছুদা বেগম ঘরের মধ্যে নিয়ে দেখান বৃষ্টির পানি ঠেকাতে ঘরের মধ্যে পলিথিন টানিয়ে নিয়েছেন। রোদ বৃষ্টিতে দারুন কষ্টে তারা জীবন যাপন করে আসছে। এরই মধ্যে একটি ছেলে ও দুইটি মেয়ের লোখাপড়া করাচ্ছেন। ওই প্রকল্পের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সিডরের সময় বিধ্বস্ত হওয়া ঘরগুলো মেরামত করা হয়নি। ফলে ওই ঘরের বাসিন্দারা অন্যত্র চলে গেছে।
আমরাজুড়ী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মহাদেব আচার্য্য জানান, নানা দুর্যোগসহ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ওই আবাসনের ঘরগুলো মেরামত বা সংস্কার না করায় ৮০ ভাগ ছাউনীর টিন মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ছিদ্রসহ অনেক স্থানে ছাউনী সম্পূর্ন নষ্ট হয়ে গেছে। আশ্রায়নের অধিকাংশ হত দরিদ্র মানুষ মাছ ধরে, শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। নলকুপগুলো অকেজো আজ প্রায় ৮ বছর। লেট্রিনগুলো ব্যবহারের অনোপযোগী হয়ে গেছে। নাম মাত্র রিং স্লাব দিয়ে তৈরি করা লেট্রিন ব্যবহার করছে তারা। ফলে অশ্রায়নে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। গন্ধর্ব প্রকল্পের ব্যরাক হাউজে ১০০টি পরিবারের ৫ থেকে ৬ শ’ লোক বাস করে। টিনগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পলিথিন কিংবা খড় কুটো দিয়ে ছেয়ে জীবন যাপন করছে। সামান্য বৃষ্টি হলেও সব পানি ঘরে পড়ে।
গন্ধর্ব আশ্রায়নের বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন, মাহিনুর বেগমসহ অনেকেই জানান তাদের সন্তানদের লেখা পড়া করানোর মত কোন সুযোগ নেই। বাধ্য হয়েই বাবার সাথে শিশু কালেই কাজে নেমে পড়ে।
ওই এলাকার ইউপি মেম্বার আফজাল হোসেন জানান, বিদ্যালয় আশ্রায়ন থেকে বেশ দুরে হওয়ায় শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এসব দুরাবস্থার কথা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা হচ্ছে না।
কাউখালী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুর রশিদ মিল্টন বলেন, বরাদ্ধ পাওয়ার জন্য চাহিদা পত্র পাঠানো হয়েছে। আমড়াজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামসুদ্দেহা চান বলেন বিষয়টি উপজেলা পরিষদের সভায় উপস্থান করেছি। উপজেলা পরিষদ তা জেলাকে অবহিত করেছেন। তাছাড়াও দুরাবস্থা দুরীকরনের জন্য আশ্রায়নবাসীদের আবেদন সুপারিশ করে জেলা প্রশাসকের বরাবরে পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তিনি জানান, সবক’টি প্রকল্প দেখার সুযোগ হয়নি। অফিস থেকে সার্ভেয়ার পাঠিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করিয়ে একটি প্রস্তাব পাঠাবেন বলে জানান।
উপজেলা চেয়ারম্যান এস. এম আহসান কবীর জানান, বিষয়টি খুবই দুঃখ জনক। আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর নির্মান করার পর কোন প্রকার রক্ষনাবেক্ষনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। উপজেলা পরিষদে এডিপির যে টাকা বরাদ্ধ পাওয়া যায় তা সব দিয়ে একটি ব্যারাক হাউজও মেরামত করা সম্ভব নয়। তিন বছর পূর্বে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মহোদয় প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করেছিলেন তাকে সব কিছু জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোন ব্যবস্থা হয়নি। তিনি বলেন জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে পরামর্শ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial